Subscribe Us

মুত্তাকীর আসল পরিচয়: বাহ্যিক নয়, ভেতরের ঈমান”

 মুত্তাকীর আসল পরিচয়: বাহ্যিক নয়, ভেতরের ঈমান”


হে আমার রব!
আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে।
আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই যেন তারা আমার নিকটে উপস্থিত না হয়।
সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য,
যিনি সকল জগতের প্রতিপালক।
শান্তি বর্ষিত হোক তাদের উপর,
যারা হেদায়েত অনুসরণ করে।

বন্ধুগণ!
আমরা আজ এমন এক সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি,
যেখানে ইসলামকে খুব সহজ করে ফেলা হয়েছে,
কিন্তু সেই সহজ করা জিনিসটাই আসলে আমাদেরকে মূল সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
আমরা এখন দীনকে চিনতে শিখেছি টুপির রং দিয়ে।
আমরা এখন ঈমান মাপি দাড়ির আকার দিয়ে।
আমরা এখন মানুষকে বিচার করি জামার ঝুল দেখে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটাই কি কোরআনের ইসলাম?
এটাই কি আল্লাহর নির্ধারিত মানদণ্ড?
নাকি আমরা নিজেরাই কিছু মানদণ্ড তৈরি করে নিয়েছি,
যেটাকে আমরা দীন বলে চালিয়ে দিচ্ছি।

বন্ধুগণ!
কোরআন যখন মুত্তাকীর কথা বলে,
তখন সে কখনো বলে না—তার টুপি কেমন,
তার দাড়ি কত লম্বা, তার পাঞ্জাবি কত ছোট।
কোরআন সরাসরি মানুষের ভেতরের দিকে আঘাত করে।
কোরআন মানুষের চরিত্র নিয়ে কথা বলে।
কোরআন মানুষের সততা নিয়ে কথা বলে।
কোরআন মানুষের নৈতিকতা নিয়ে কথা বলে।
আর এখানেই আমাদের বড় সমস্যা।
আমরা ভেতরটা বাদ দিয়ে বাইরেটাকে আঁকড়ে ধরেছি।

বন্ধুগণ!
একটু ভেবে দেখুন—একজন মানুষ নামাজ পড়ে,
কিন্তু ব্যবসায় মিথ্যা বলে।
একজন মানুষ রোজা রাখে,
কিন্তু সুযোগ পেলে ঘুষ খায়।
একজন মানুষ হজ করে,
কিন্তু মানুষের হক মেরে খায়।
এই মানুষটা কি মুত্তাকী?
এই মানুষটা কি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য?
কোরআন কী বলে—
সেটাই আমাদের দেখতে হবে।

বন্ধুগণ!
আল্লাহ সূরা বাকারা ১৭৭ নম্বর আয়াতে
স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন

لَّيْسَ الْبِرَّ أَن تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ
অর্থাৎ পূর্ব বা পশ্চিম দিকে মুখ ফিরানোই কোনো পূর্ণ পুণ্য নয়।
মানে শুধু নামাজের দিক ঠিক করলেই সব ঠিক হয়ে যায় না।
শুধু বাহ্যিক নিয়ম পালন করলেই একজন মানুষ মুত্তাকী হয়ে যায় না।

বন্ধুগণ!
এই আয়াতটা আমাদের একটা বড় ভুল ভেঙে দেয়।
আমরা মনে করি—নামাজ পড়লেই সব ঠিক।
আমরা মনে করি—
কিছু রীতি পালন করলেই আমরা ভালো মুসলিম।
কিন্তু আল্লাহ বলছেন—না, বিষয়টা এত সহজ না।
এর ভেতরে আরও অনেক কিছু আছে।

এরপর আল্লাহ বলেন—
وَلَٰكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ...
অর্থাৎ প্রকৃত পুণ্যবান হলো সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহ,
পরকাল, ফেরেশতা, কিতাব এবং নবীদের প্রতি ঈমান আনে।
এখানে একটা বিষয় লক্ষ্য করুন—
এখানে কোনো বাহ্যিক চিহ্নের কথা বলা হয়নি।
এখানে বলা হয়েছে—বিশ্বাসের কথা।
অন্তরের ঈমানের কথা।

বন্ধুগণ!
ঈমান মানে শুধু মুখে বলা না।
ঈমান মানে শুধু “আমি মুসলিম” বলা না।
ঈমান মানে এমন এক বিশ্বাস,
যা আপনার কাজের মধ্যে প্রকাশ পাবে।
আপনি একা থাকলেও হারাম কাজ করতে ভয় পাবেন।
আপনি অন্ধকারে থাকলেও অন্যায় করতে সাহস পাবেন না।
কারণ আপনি জানেন—আল্লাহ আপনাকে দেখছেন।

বন্ধুগণ!
কিন্তু আজ আমরা কী করছি?
আমরা মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ছি।
তারপর বের হয়ে সুদের লেনদেন করছি।
আমরা তাসবিহ হাতে জিকির করছি।
কিন্তু সেই হাতেই ঘুষ নিচ্ছি।
আমরা বাজারে দাঁড়িয়ে দাম বলছি।
কিন্তু মাপে কম দিচ্ছি।

এটা কি ঈমান?
এটা কি তাকওয়া?
না, এটা একটা বড় প্রতারণা—
নিজের সাথে, এবং আল্লাহর সাথে।

বন্ধুগণ!
আল্লাহ মুত্তাকীর আরেকটি গুণ বলেছেন—
وَآتَى الْمَالَ عَلَىٰ حُبِّهِ...
অর্থাৎ সে নিজের ভালোবাসার সম্পদ অন্যদের জন্য ব্যয় করে।
এখানে শুধু দান করার কথা বলা হয়নি।
এখানে বলা হয়েছে—
প্রিয় জিনিস থেকে দান করার কথা।

আজ আমরা কী করি?
যা আমাদের দরকার নেই, সেটাই দান করি।
যা পুরোনো, সেটাই দিয়ে দেই।
যা আমাদের কাছে মূল্যহীন, সেটাই গরিবকে দেই।
কিন্তু কোরআন বলছে—না,
মুত্তাকী সে, যে নিজের প্রিয় জিনিস থেকে দেয়।

বন্ধুগণ!
আজ দানও একটা প্রদর্শনী হয়ে গেছে।
দান করলে ছবি তুলতে হয়।
দান করলে নাম ঘোষণা করতে হয়।
দান করলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিতে হয়।
কিন্তু কোরআনের মুত্তাকী এমন না।
সে গোপনে দেয়।
সে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দেয়।

বন্ধুগণ!
এরপর আল্লাহ বলেন—
وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَاهَدُوا
অর্থাৎ তারা অঙ্গীকার পূরণ করে।
এই একটা গুণ যদি আমরা সমাজে ফিরিয়ে আনতে পারতাম—সবকিছু বদলে যেত।

আজ মানুষের কথার কোনো দাম নেই।
ব্যবসায় মিথ্যা প্রতিশ্রুতি।
বন্ধুত্বে বিশ্বাসঘাতকতা।
বিয়েতে প্রতারণা।
সব জায়গায় একটা জিনিস কমে গেছে—বিশ্বাস।

কিন্তু মুত্তাকী কখনো এমন না।
সে কথা দিলে সেটা রাখে।
সে প্রতিশ্রুতি দিলে সেটা পূরণ করে।
কারণ সে জানে—আল্লাহ সবকিছু দেখছেন।

বন্ধুগণ! এরপর আল্লাহ ধৈর্যের কথা বলেছেন।
কষ্টে ধৈর্য।
দারিদ্র্যে ধৈর্য।
সংকটে ধৈর্য।

আমরা আজ খুব সহজে ভেঙে পড়ি।
সামান্য সমস্যা হলেই আমরা হতাশ হয়ে যাই।
আমরা আল্লাহকে প্রশ্ন করি—“কেন আমার সাথে?”
কিন্তু মুত্তাকী এমন না।
সে কষ্টের মধ্যেও স্থির থাকে।
সে বিশ্বাস করে—আল্লাহ যা করেন,
ভালোর জন্যই করেন।

বন্ধুগণ!
এই সব গুণ একসাথে মিলিয়ে আল্লাহ শেষে ঘোষণা দেন—
أُولَٰئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
অর্থাৎ এরাই সত্যবাদী, এরাই মুত্তাকী।

এখন নিজের কাছে প্রশ্ন করুন—
আমরা কি এই তালিকার মধ্যে আছি?
নাকি আমরা শুধু বাহ্যিক কিছু চিহ্ন ধরে,
অর্থাত টুপি পরে টিকি রেখে নিজেকে ভালো ভাবছি?
জবাবদিহির কেন এত ঘটা যদি দেবতাই হও,
টুপি পরে টিকি রেখে সদা বল তুমি পাপি নও?
পাপি নও যদি কেন এ ভরং ট্রেড মার্কার ধুম?
পুলিশি পোষাক পড়িয়া হয়েছে পাপের আসামী গুম।

বন্ধুগণ!
আজ সময় এসেছে—নিজেকে যাচাই করার।
আজ সময় এসেছে—
কুরআনের আলোয় নিজের জীবনকে মাপার।
আজ সময় এসেছে—
বাইরের চেহারা নয়, ভেতরের মানুষটাকে ঠিক করার।

বন্ধুগণ!
আমরা যদি সত্যিই মুত্তাকী হতে চাই—
তাহলে আমাদেরকে কুরআনের এই সংজ্ঞা মেনে চলতে হবে।
আমাদেরকে সত্যবাদী হতে হবে।
আমাদেরকে ন্যায়বান হতে হবে।
আমাদেরকে মানুষের হক আদায় করতে হবে।

বন্ধুগণ!
মনে রাখবেন—
আল্লাহ আপনার টুপি দেখবেন না।
আল্লাহ আপনার দাড়ি দেখবেন না।
আল্লাহ আপনার পোশাক দেখবেন না।
আল্লাহ দেখবেন—আপনার অন্তর।
আল্লাহ দেখবেন—আপনার কাজ।

বন্ধুগণ!
তাই আসুন—
আমরা বাহ্যিকতা থেকে বের হয়ে আসি।
আমরা কুরআনের আসল শিক্ষা গ্রহণ করি।
আমরা নিজেদেরকে সত্যিকারের মুত্তাকী বানানোর চেষ্টা করি।

Post a Comment

0 Comments