জালেমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নাকি আকিদার বিচার?
আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল ‘আলামীন।
আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী আনযালা ‘আলা ‘আব্দিহিল কিতাব।
আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী খালাকাল ইনসান, আল্লামাহুল বায়ান।
সালামুন আলা মুহাম্মাদ আল্লাযি যা’য়া বিল কুরআনি মুহাইমিনা।
ওয়া সালামুন আলাল মুরসালিন।
বন্ধুগণ!
আজ আমরা একটি কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড়াবো।
এই প্রশ্ন রাজনীতি নয়।
এই প্রশ্ন মানবতা।
এই প্রশ্ন ন্যায়বিচার।
এই প্রশ্ন কুরআনের নৈতিক অবস্থান।
আজ প্রশ্ন করা হচ্ছে—
তোমরা কেন ইরানের পক্ষে দাঁড়াচ্ছ?
তোমরা কি শিয়াদের আকিদা সমর্থন করছ?
বন্ধুগণ!
এই প্রশ্নের আগে আরেকটি প্রশ্ন করা দরকার।
তোমার আকিদা কি পুরোপুরি বিশুদ্ধ?
তোমার সমাজ কি পুরোপুরি শিরকমুক্ত?
তোমার চারপাশে কি কোনো ভ্রান্ত আকিদা নেই?
তোমার সুন্নী আকিদার লোকেরা কি কবর পুজা করেনা?
তোমার সুন্নী আকিদার লোকেরা কি পীরের পায়ে সিজদা মারেনা?
তোমার সুন্নী আকিদার এক পীর নাকি নবীর জামাই হয়ে গেছে,
তোমার পীর সাহেবতো আল্লাহর আন্দাজ নাই বলছে।
তোমার সুন্নী আকিদার অনেক পীর এমন জঘন্য আকিদা পোষণ করে যে, শীয়াদেরকেও হার মানায়।
বন্ধু
তুমি যদি সৎভাবে একবার নিজের দিকে তাকাও—
দেখবে তোমার সমাজও শতদলে বিভক্ত।
তোমার সমাজেও নানা মতবাদ আছে।
তোমার সমাজেও নানা দল আছে।
কেউ কবরকে ঘিরে অতিরঞ্জিত বিশ্বাস করে।
কেউ অলৌকিক ক্ষমতার দাবি করে।
কেউ ধর্মকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত প্রভাব বাড়ায়।
অর্থাৎ সমস্যা শুধু অন্যের মধ্যে নয়।
সমস্যা তোমার মধ্যেও আছে।
যদি তুমি একবার বিবেক খাটিয়ে ভাবতে পার।
কুরআন মানুষকে প্রথমে নিজেকে দেখার শিক্ষা দেয়।
আল্লাহ বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ
হে ঈমানদারগণ!
তোমাদের নিজেদের দিকে লক্ষ্য রাখো। (সূরা মায়েদা : ১০৫)
কাজী নজরুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন,
ধর্মান্ধরা শোনো,
অন্যের পাপ গনিবার আগে নিজেদের পাপ গোনো!
হেথা সবে সম পাপী,
আপন পাপের বাট্খারা দিয়ে অন্যের পাপ মাপি!
জবাবদিহির কেন এত ঘটা যদি দেবতাই হও,
টুপি প’রে টিকি রেখে সদা বল যেন তুমি পাপী নও।
পাপী নও যদি কেন এ ভড়ং, ট্রেডমার্কার ধুম?
পুলিশী পোশাক পরিয়া হ’য়েছ পাপের আসামী গুম।
বন্ধুগণ!
অন্যের ভুল দেখার আগে
নিজের ভুল দেখা জরুরি।
আমরা যদি নিজেদের ভুল না দেখি
তাহলে আমাদের বিচার ন্যায়ভিত্তিক হবে না।
বন্ধুগণ!
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—
আকিদার প্রশ্ন এবং জুলুমের প্রশ্ন এক জিনিস নয়।
কোনো মানুষের আকিদা ভুল হতে পারে।
কিন্তু তার উপর জুলুম করা বৈধ হয়ে যায় না।
কুরআন একটি বড় নীতি দিয়েছে।
আল্লাহ বলেন—
"কোনো জাতির প্রতি বিদ্বেষ
তোমাদেরকে যেন ন্যায়বিচার থেকে বিরত না করে।
ন্যায়বিচার করো।
এটাই তাকওয়ার কাছাকাছি।" (সূরা মায়েদা : ৮)
এই আয়াত আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়।
কাউকে অপছন্দ করা যায়।
কাউকে সমালোচনা করা যায়।
কিন্তু ন্যায়বিচার কখনোই হারানো যাবেনা।
বন্ধুগণ!
ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখবো—
নবীদের বিরুদ্ধেও মানুষ নানা অভিযোগ তুলেছিল।
কিন্তু কুরআন কখনো জুলুমের পক্ষ নেয়নি।
আল্লাহ বলেন—
আল্লাহ প্রকাশ্যে মন্দ কথা পছন্দ করেন না
তবে যার উপর জুলুম হয়েছে সে ছাড়া। (সূরা নিসা : ১৪৮)
বন্ধুগণ!
অর্থাৎ কুরআনের দৃষ্টিতে
মজলুমের পাশে দাঁড়ানো একটি নৈতিক দায়িত্ব।
এখানে প্রথম প্রশ্ন আসে—
আমরা কি মজলুমের পাশে দাঁড়াচ্ছি?
নাকি আকিদার বিতর্কে মজলুমকে একা ফেলে দিচ্ছি?
বন্ধুগণ!
কুরআন আমাদের একটি বড় নীতি শিখিয়েছে।
আল্লাহ বলেন—
وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ
তোমাদের কী হলো
তোমরা কেন লড়াই করো না
আল্লাহর পথে
এবং সেই দুর্বল মানুষের জন্য? (সূরা নিসা : ৭৫)
বন্ধুগণ!
এই আয়াতে একটি শব্দ আছে—
المستضعفين
অর্থাৎ অত্যাচারিত মানুষ।
কুরআনের দৃষ্টিতে
অত্যাচারিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো
একটি নৈতিক দায়িত্ব।
এখানে তাদের আকিদা নিয়ে আলোচনা করা হয়নি।
এখানে তাদের মজলুম হওয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বন্ধুগণ!
আজ আমরা কী করছি?
আমরা প্রথমে জিজ্ঞেস করি—
তাদের আকিদা কী?
তারপর সিদ্ধান্ত নেই—
তাদের পাশে দাঁড়াবো কি দাঁড়াবো না।
কিন্তু কুরআনের নীতি ভিন্ন।
কুরআন প্রথমে জিজ্ঞেস করে—
তাদের উপর জুলুম হচ্ছে কি না।
জুলুম কি? জালেম কি?
বন্ধুগণ!
জুলুমকারীদের সমন্ধে আল্লাহ কি বলেন?
কুরআন বলে—
وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ
আল্লাহ জালেমদের ভালোবাসেন না।
(সূরা আলে ইমরান : ৫৭)
জালেম মানে শুধু হত্যাকারী নয়।
জালেম মানে অত্যাচারী।
জালেম মানে অধিকার হরণকারী।
জালেম মানে অন্যের উপর অন্যায় চাপিয়ে দেওয়া।
বন্ধুগণ!
যখন কোনো জাতির উপর বোমা পড়ে।
যখন শিশু মারা যায়।
যখন ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়।
যখন মানুষকে অবরুদ্ধ করা হয়—
এগুলো জুলুম।
এগুলো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
বন্ধুগণ!
এখন প্রশ্ন—
জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আগে
আমরা কি আকিদার তালিকা দেখি?
কুরআন এমন কোনো নীতি দেয়নি।
বরং কুরআন ন্যায়ের নীতি দিয়েছে।
আল্লাহ বলেন—
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ
নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়ের নির্দেশ দেন। (সূরা নাহল : ৯০)
ন্যায় কি?
বন্ধুগণ!
ন্যায় মানে পক্ষপাতহীন অবস্থান।
ন্যায় মানে সত্যের পাশে দাঁড়ানো।
ন্যায় মানে জালেমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো
যে-ই হোক।
আজ পৃথিবীতে একটি বড় সমস্যা হলো
আমরা নৈতিকতার বদলে পক্ষ বেছে নিই।
যদি কেউ আমাদের মতাদর্শের হয়
তাহলে আমরা তাকে সমর্থন করি।
যদি কেউ আমাদের মতাদর্শের না হয়
তাহলে আমরা তার বিরুদ্ধে দাঁড়াই।
কিন্তু কুরআনের শিক্ষা ভিন্ন।
কুরআন আমাদের দল নয়
ন্যায় বেছে নিতে শিখিয়েছে।
বন্ধুগণ!
আজ একটি প্রশ্ন আমাদের সামনে দাঁড়ায়।
আমরা কি ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াচ্ছি?
নাকি শুধু নিজেদের পক্ষের পক্ষে দাঁড়াচ্ছি?
কুরআন আবার একটি বড় সতর্কতা দিয়েছে।
আল্লাহ বলেন—
كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ
ন্যায়ের উপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়াও।
আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দাও।
যদিও তা নিজের বিরুদ্ধে হয়। (সূরা নিসা : ১৩৫)
বন্ধুগণ!
এই আয়াত আমাদের শেখায়—
সত্যের পাশে দাঁড়ানো সহজ নয়।
কখনো নিজের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে হয়।
আমাদের সমাজে অনেক সময়
আকিদার বিতর্ক এত বড় হয়ে যায়
যে মানবতার প্রশ্ন হারিয়ে যায়।
মানুষ মারা যাচ্ছে।
শিশুরা কাঁদছে।
ঘরবাড়ি ধ্বংস হচ্ছে।
কিন্তু আমরা বিতর্ক করছি—
তাদের মতবাদ কী?
বন্ধুগণ!
এটি কুরআনিক নীতি নয়।
কুরআন মানবতার নীতি দিয়েছে।
একটি কথা মনে রাখা জরুরি।
ভুল আকিদা সমালোচনা করা যাবে।
ভ্রান্ত মতবাদ নিয়ে আলোচনা করা যাবে।
কিন্তু জুলুমকে সমর্থন করা যাবে না।
কারণ কুরআন স্পষ্টভাবে বলেছে—
وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
অপরাধ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।
(সূরা মায়েদা : ২)
বন্ধুগণ!
জালেমের পাশে দাঁড়ানো মানে,
জুলুমকে সমর্থন করা।
আর জুলুমকে সমর্থন করা মানে,
কুরআনের নীতির বিরুদ্ধে দাড়ানো।
বন্ধুগণ!
আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন
নৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করা।
দল নয়। মতবাদ নয়। পক্ষ নয়।
ন্যায়।
ন্যায়কে কেন্দ্র করে দাঁড়ানো।
কুরআনের শিক্ষা হলো—
জালেমের বিরুদ্ধে দাঁড়াও।
মজলুমের পাশে দাঁড়াও।
সে যে-ই হোক।
0 Comments