Subscribe Us

ছাগলে কুরআনের আয়াত খেয়ে ফেলেছে”—কুরআনের আলোকে সত্য অনুসন্ধান

 ছাগলে কুরআনের আয়াত খেয়ে ফেলেছে”—কুরআনের আলোকে সত্য অনুসন্ধান


বন্ধুগণ,
আজ আমরা এমন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি,
যা শুনলে অনেকের মন কেঁপে ওঠে,
আবার অনেকেই চিন্তা না করেই তা বিশ্বাস করে ফেলে। আমরা এমন একটি বর্ণনার কথা বলছি,
যেখানে বলা হয়েছে—
একটি ছাগল নাকি কুরআনের কিছু আয়াত খেয়ে ফেলেছে।

বন্ধুগণ,
এই কথাটি যদি আমরা সরলভাবে গ্রহণ করি,
তাহলে আমাদের ঈমানতো ধংশ্ব হবেই, 
কুরআনের প্রতি বিশ্বাস,
এবং আল্লাহর প্রতিশ্রুতি—
সবকিছুই প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়।

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত—
তিনি বলেন,
প্রাপ্তবয়স্কদের দশবার দুধ পান করানো,
এবং রজম সংক্রান্ত আয়াত নাযিল হয়েছিল।
এগুলো একটি সাহিফায় লেখা ছিল,
যা আমি আমার খাটের নিচে রেখে দিয়েছিলাম।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালের সময় আমরা
সে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় একটি ছাগল এসে
সেই সাহিফাটি খেয়ে ফেলে।
(ইবনু মাযাহ হাঃ ১৯৪৪)

বন্ধুগণ,
এই বর্ণনাটি যখন আমরা শুনি,
তখন আমাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত—
আমরা থামবো, চিন্তা করবো, এবং প্রশ্ন করবো।
কারণ আমাদের ঈমান কোনো গল্পের উপর দাঁড়ানো নয়;
আমাদের ঈমান দাঁড়িয়ে আছে আল্লাহর কিতাবের উপর।

বন্ধুগণ,
আমরা যদি এই বর্ণনাটিকে সত্য ধরে নিই,
তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়—
কুরআনের কিছু অংশ নাজিল হয়েছিল,
কিন্তু পরে তা ছাগলে খেয়ে ফেলেছে।
এখন প্রশ্ন হলো—এটা কি কুরআনের সাথে মেলে?

বন্ধুগণ, আল্লাহ কুরআনে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন—

﴿إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ﴾

অর্থ: নিশ্চয়ই আমিই এই স্মরণিকা নাজিল করেছি,
এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী। (১৫:৯)

বন্ধুগণ,
এই আয়াতটি খুবই স্পষ্ট।
এখানে আল্লাহ নিজেই বলছেন—
তিনি কুরআন নাজিল করেছেন এবং তিনিই তা সংরক্ষণ করবেন।
এখানে কোথাও বলা হয়নি—
কুরআনের সংরক্ষণ মানুষের উপর নির্ভরশীল,
বা কোনো কাগজের উপর নির্ভরশীল,
বা কোনো পশুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার উপর নির্ভরশীল।

বন্ধুগণ,
এখন আমরা চিন্তা করি—
একটি ছাগল এসে কুরআনের আয়াত খেয়ে ফেলেছে,
এই হাদিস কুরআনের উপর সন্দেহ সৃষ্টি করে,
না জানি এভাবে কুরআনের কত আয়াত খেয়ে ফেলেছে।
আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এর সংরক্ষণের দায়ীত্ব আল্লাহর,
তাহলে এই আয়াতের অর্থ কী দাঁড়ায়?
তাহলে কি আল্লাহ তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেননি?
না, কখনোই না।
আল্লাহর কথা সত্য, আর মানুষের বর্ণনা ভুল।
এটা নাস্তিকদের বানানো তথাকথিত সহীহ হাদিস।

বন্ধুগণ, আল্লাহ আরও বলেন—

﴿إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ﴾
এর সংকলন ও পাঠ আমাদেরই দায়িত্ব। (৭৫:১৭)

বন্ধুগণ,
এই আয়াত আমাদেরকে আরেকটি সত্য জানায়—
কুরআনের সংকলন কোনো এলোমেলো ঘটনানির্ভর নয়। এটি আল্লাহর তত্ত্বাবধানে হয়েছে।
তাহলে একটি কাগজ হারিয়ে গেলে কি
কুরআন হারিয়ে যাবে? কক্ষনোই না।

বন্ধুগণ,
আমরা জানি—কুরআন শুধু কাগজে লেখা ছিল না।
সাহাবিরা কুরআন মুখস্থ করতেন,
পড়তেন, শিখাতেন।
একটি কাগজ নষ্ট হয়ে গেলে কুরআন নষ্ট হয়ে যায়—
এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।

বন্ধুগণ, আল্লাহ বলেন—

﴿سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنسَىٰ﴾
আমি তোমাকে পাঠ করাবো, তুমি ভুলবে না। (৮৭:৬)

এই আয়াতটি আমাদের দেখায়—
কুরআনের সংরক্ষণ মানুষের হৃদয়ে।
এটি শুধু লিখিত কাগজে সীমাবদ্ধ নয়।

বন্ধুগণ,
এখন একটি সহজ উদাহরণ দিই।
ধরুন, আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বই মুখস্থ করেছেন।
এখন যদি সেই বইয়ের কাগজ নষ্ট হয়ে যায়,
তাহলে কি আপনার জ্ঞান নষ্ট হয়ে যাবে? না।
কারণ তা আপনার মনে আছে।
ঠিক তেমনিভাবে কুরআনও মানুষের হৃদয়ে সংরক্ষিত ছিল।

বন্ধুগণ,
এই বর্ণনাটির আরেকটি সমস্যা হলো—
যে বিষয়গুলোকে এখানে “আয়াত” বলা হচ্ছে,
সেগুলো বর্তমান কুরআনে নেই।
এবং সেগুলো কুরআনের নৈতিক কাঠামোর সাথেও মেলে না।

কুরআনের বিধানগুলো স্পষ্ট,
প্রকাশ্য এবং সবার জন্য জানা।
এমন কোনো গোপন আয়াত নেই,
যা শুধু একটি কাগজে ছিল এবং পরে হারিয়ে গেছে।

এখন আমরা আবার চিন্তা করি—
যদি সত্যিই একটি ছাগল কুরআনের আয়াত খেয়ে ফেলে,
তাহলে এর মানে কী?
তাহলে কি আমাদের কুরআন অসম্পূর্ণ?
তাহলে কি আমরা যে কুরআন পড়ছি, তা সম্পূর্ণ নয়?
এই চিন্তা আমাদের ঈমানকে দুর্বল করে দেয়।

বন্ধুগণ,
আল্লাহর কিতাব কখনো অসম্পূর্ণ হতে পারে না।
আল্লাহর কথা কখনো হারিয়ে যেতে পারে না।
কারণ আল্লাহ নিজেই এর সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন।

তাই আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিতে পৌঁছাই—
যদি কোনো বর্ণনা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হয়,
তাহলে আমরা সেই বর্ণনাকে প্রশ্ন করবো।
আল্লাহ বলেন—

﴿وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ﴾
যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই,
তার অনুসরণ করো না। (১৭:৩৬)

বন্ধুগণ,
এই আয়াত আমাদের শেখায়—
যাচাই না করে কিছু বিশ্বাস করা ঠিক নয়।
একটি ছোট উদাহরণ দিই।
ধরুন, কেউ বলল—
একটি আগুন ষাট হাত পানির নিচে জ্বালানো হয়েছে।
আপনি কি সেটি বিশ্বাস করবেন? না।
কারণ আমরা জানি, আগুন পানির নিচে জলেনা।
ঠিক তেমনিভাবে,
ছাগল কুরআনের আয়াত খেয়ে ফেলেছে—
এই কথাটিও বাস্তবতার সাথে মেলে না।
কুরআনের সাথে মেলেনা।

বন্ধুগণ,
আমাদের ঈমান হতে হবে শক্ত,
পরিষ্কার এবং কুরআনের উপর ভিত্তি করে।
আমরা যেন এমন কিছু বিশ্বাস না করি,
যা আমাদেরকে সন্দেহে ফেলে।
আল্লাহ বলেন—

﴿وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِنْ شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ﴾
যে বিষয়ে তোমাদের মতভেদ,
তার ফয়সালা আল্লাহর কাছে। (৪২:১০)

বন্ধুগণ,
তাই আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে কুরআনের উপর ভিত্তি করে।
“ছাগলে কুরআনের আয়াত খেয়ে ফেলেছে”—
এই বর্ণনা কুরআনের সংরক্ষণ-ঘোষণার সাথে মেলে না।
তাই এটিকে আকীদার অংশ বানানো যায় না।

বন্ধুগণ, আমাদের নীতি হওয়া উচিত—
✔ কুরআনের সাথে মিললে গ্রহণ
❌ কুরআনের বিরোধী হলে—বর্জন

বন্ধুগণ,
আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি—
আমরা কুরআনকে আমাদের জীবনের একমাত্র মানদণ্ড বানাবো।
আমাদের স্লোগান— “কুরআনই মীযান।”
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সত্য বুঝার
এবং কুরআনের পথে চলার তাওফিক দান করুন।
রব্বানা তাকব্বাল দুআ।
সালামুন আলাইকুম। 

Post a Comment

0 Comments