Subscribe Us

আকিমুস সালাতের বাস্তবতা

 আকিমুস সালাতের বাস্তবতা


সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।
সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি মানুষের জন্য কুরআন নাযিল করেছেন।
সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি মানুষকে বুদ্ধি দিয়েছেন, বিবেক দিয়েছেন, চিন্তা করার ক্ষমতা দিয়েছেন।
শান্তি বর্ষিত হোক সেই সকল নবীদের প্রতি যারা মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ডেকেছেন।

বন্ধুগণ,
মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তির কথাই সর্বোত্তম যে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে।
সে নিজে সৎকর্মে অটল থাকে।
এবং নিজের পরিচয় দেয় একজন মুসলিম হিসেবে।

وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ

অর্থ: সেই ব্যক্তির চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে
যে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে,
সৎকর্ম করে এবং বলে আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত। (ফুসসিলাত ৪১:৩৩)

বন্ধুগণ,
আজ আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করছি।
এই বিষয়টি শুধু ইবাদতের নয়।
এটি জীবন ব্যবস্থার সাথে জড়িত।
আমরা অনেকেই সালাত আদায় করি।
কিন্তু খুব কম মানুষই বুঝে করি।
আর খুব কম মানুষই তা জীবনে বাস্তবায়ন করি।

বন্ধুগণ,
তাই আমাদের প্রথম কাজ হলো বোঝা।
সালাত আসলে কী।
এবং “আকিমুস সালাত” বলতে কী বোঝায়।
আল্লাহ কুরআনে বারবার আমাদের চিন্তা করতে বলেছেন।
শুধু পড়তে নয়।
গভীরভাবে উপলব্ধি করতে বলেছেন।

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ

তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না।
(নিসা ৪:৮২)

কিন্তু বাস্তবে আমরা কী করি।
আমরা পড়ি কিন্তু বুঝি না।
আমরা শুনি কিন্তু চিন্তা করি না।
ফলে কুরআনের বাণী আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলে না। এটি শুধু একটি রিচুয়াল হয়ে দাঁড়ায়।
জীবনের অংশ হয় না।

বন্ধুগণ,
এখন আমরা একটি বাস্তব প্রশ্ন করি।
যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি হিদায়াত আসে।
তাহলে আমাদের করণীয় কী।
আল্লাহ নিজেই সেই উত্তর দিয়েছেন।

فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَن تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ

অর্থ: যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে হিদায়াত আসবে, তখন যারা তা অনুসরণ করবে তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিত হবে না। (বাকারা ২:৩৮)

বন্ধুগণ,
এখানে একটি শব্দ খুব গুরুত্বপূর্ণ।
সেটি হলো “তাবিআ” অর্থাৎ অনুসরণ করা।
শুধু বিশ্বাস নয়। শুধু জানা নয়।
বরং বাস্তবে মেনে চলা।
অর্থাৎ কুরআন এসেছে বাস্তবায়নের জন্য।
জীবনে প্রয়োগ করার জন্য।
শুধু তিলাওয়াত করার জন্য নয়।

বন্ধুগণ,
তাই আমরা যদি এই কুরআনকে বুঝতে না পারি।
এবং জীবনে প্রয়োগ না করি।
তাহলে আমরা এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলি।
এখান থেকেই আমাদের যাত্রা শুরু।
আমরা ধাপে ধাপে বুঝার চেষ্টা করবো।
সালাত কী।
এবং আকিমুস সালাত কীভাবে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়।

আকিমুস সালাত বলতে কি বুঝায়?

বন্ধুগণ,
আকিমুস সালাত কীভাবে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়
তা বুঝার জন্য আমাদের আগে বুঝতে হবে।

হিদায়াত আসলে কি?

এখন আমরা বুঝতে চাই এই হিদায়াত আসলে কী।
আল্লাহ নিজেই কুরআন সম্পর্কে ঘোষণা দিয়েছেন।

ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ

এই সেই একটি নির্দিষ্ট কিতাব যাতে কোনো সন্দেহ নেই,
এটি মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত। (বাকারা ২:২)
এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে এই কিতাবই হিদায়াত।
অর্থাৎ কুরআনই সেই পথনির্দেশ যা আল্লাহ মানুষের জন্য নির্ধারণ করেছেন।

বন্ধুগণ,
কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করুন।
এটি সবার জন্য কার্যকর হয় না।
এটি মুত্তাকীদের জন্য।
এখন প্রশ্ন আসে মুত্তাকী কারা।
মুত্তাকী হলো সেই ব্যক্তি যে সচেতনভাবে আল্লাহকে ভয় করে।
যে নিজের জীবনকে আল্লাহর নির্দেশনার আলোকে পরিচালিত করে।
আল্লাহ বলেন।

إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ

নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি যে সবচেয়ে মুত্তাকী। (হুজরাত ৪৯:১৩)
কিন্তু বাস্তবতা হলো আমরা সবাই সেই পর্যায়ে নেই।
আমরা অনেকেই সাধারণ মানুষ।
আমাদের মধ্যে দুর্বলতা আছে।
তাহলে কি আমরা হিদায়াত থেকে বঞ্চিত হবো।
না, আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ পথও রেখেছেন।
আল্লাহ বলেন।

الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ

যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে
এবং তার মধ্যে যা উত্তম তা অনুসরণ করে,
আল্লাহ তাদেরকেই হিদায়াত দেন। (যুমার ৩৯:১৮)
অর্থাৎ আমাদের কাজ হলো মনোযোগ দিয়ে শোনা।
তারপর যাচাই করা।
এবং উত্তমটুকু অনুসরণ করা।

বন্ধুগণ,
এখানেই আমাদের বড় সমস্যা।
আমরা শুনি কিন্তু মনোযোগ দেই না।
আমরা বুঝি কিন্তু অনুসরণ করি না।
ফলে কুরআন আমাদের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারে না। এটি আমাদের কাছে শুধু একটি বই হয়ে থাকে।
জীবনের গাইডলাইন হয়ে ওঠে না।

বন্ধুগণ,
এখন আমরা আবার মূল বিষয়ে ফিরে আসি।
এই কুরআন কেন নাযিল হয়েছে।
আল্লাহ বলেন।

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ

রমজান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হিদায়াত এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী। (বাকারা ২:১৮৫)

অর্থাৎ এই কুরআন আমাদের জীবনকে সঠিক ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য করতে শেখায়।
এটি আমাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার মানদণ্ড দেয়।
তাই আমরা যদি কুরআনকে শুধু তিলাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি।
তাহলে আমরা এর মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলি।

বন্ধুগণ,
আমাদের সামনে এখন একটি স্পষ্ট পথ রয়েছে। শোনা। বোঝা। এবং অনুসরণ করা।
এই তিনটি ধাপই আমাদের হিদায়াতের দিকে নিয়ে যাবে।
এবং এখান থেকেই আমরা বুঝতে শুরু করবো সালাতের প্রকৃত অর্থ।

বন্ধুগণ,
এখন আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে আসি।
এই কুরআন বাস্তবে মানুষের কাছে কীভাবে পৌঁছেছিল।
আজকের যুগে আমরা খুব সহজে কুরআন পেয়ে যাই। মোবাইলে আছে।
বই আকারে আছে।
অনলাইনে আছে।
কিন্তু নবী (সা.)-এর যুগে এমন কিছুই ছিল না।
না ছিল মোবাইল।
না ছিল ইন্টারনেট।
না ছিল ছাপাখানা।

এমনকি কাগজও তখন সহজলভ্য ছিল না।
মানুষের বেশিরভাগই নিরক্ষর ছিল।
তাই লিখে লিখে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না।
তাহলে কীভাবে কুরআন মানুষের কাছে পৌঁছালো।
এই প্রশ্নের উত্তরই আমাদের সালাত বোঝার পথ খুলে দেয়।

বন্ধুগণ,
আল্লাহ বলেন কুরআন কীভাবে নাযিল হয়েছে।

نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ عَلَىٰ قَلْبِكَ

বিশ্বস্ত ফেরেশতা এটি আপনার অন্তরে নাযিল করেছেন। (শু'আরা ২৬:১৯৩-১৯৪)

অর্থাৎ এই কুরআন সরাসরি নবীর অন্তরে পৌঁছেছে।
এটি কোনো লিখিত বার্তা ছিল না শুরুতে।
এটি ছিল জীবন্ত ওহী।
এখন প্রশ্ন হলো নবী কীভাবে
এটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিলেন।
কারণ তার দায়িত্ব ছিল পৌঁছে দেওয়া।

ا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ

রাসূলের দায়িত্ব কেবল বার্তা পৌঁছে দেওয়া। (মায়েদা ৫:৯৯)

বন্ধুগণ,
তখন একমাত্র কার্যকর পদ্ধতি ছিল সরাসরি মানুষকে একত্রিত করা।
মানুষকে সামনে বসিয়ে শোনানো।
বারবার শোনানো।
একটি নির্দিষ্ট জায়গায় মানুষ জড়ো হতো।
নবী সেখানে দাঁড়াতেন।
এবং কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করতেন।
মানুষ মনোযোগ দিয়ে শুনত।
বারবার শুনত।
ধীরে ধীরে তা মুখস্থ হয়ে যেত।
কুরআন একবারে নাযিল হয়নি।
ধীরে ধীরে নাযিল হয়েছে।
সময়ের সাথে সাথে মানুষ তা শিখেছে।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল একটি জীবন্ত শিক্ষা ব্যবস্থা।
এটি শুধু তত্ত্ব ছিল না।
এটি ছিল বাস্তব প্রশিক্ষণ।

বন্ধুগণ,
এখন আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করি।
এই সমাবেশগুলো ছিল নিয়মিত।
এগুলো ছিল ধারাবাহিক।
নির্দিষ্ট সময়ে মানুষ একত্রিত হতো।
কারণ তখন সময় নির্ধারণের জন্য ঘড়ি ছিল না।
সূর্যের অবস্থানই ছিল প্রধান নির্দেশক।
তাই সকাল ও সন্ধ্যা ছিল সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
এই সময়গুলোতেই মানুষ সহজে একত্রিত হতে পারত।

বন্ধুগণ,
এখান থেকেই আমরা বুঝতে শুরু করি।
সালাত শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত ছিল না।
এটি ছিল একটি সমষ্টিগত প্রক্রিয়া।
এটি ছিল শেখার জায়গা।
বোঝার জায়গা।
এবং বাস্তবায়নের প্রস্তুতির জায়গা।

বন্ধুগণ, 
এখন আমরা বুঝতে চাই এই সমাবেশ বা “সালাত” আসলে কী ছিল।

এই সমাবেশ বা সালাত কি ছিল?

বন্ধুগণ,
কুরআনে আমরা বারবার দেখি
দুটি বিষয় আলাদা করে বলা হয়েছে।
একটি হলো কুরআন পাঠ।
আরেকটি হলো সালাত কায়েম।

আল্লাহ বলেন।

اتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الْكِتَابِ وَأَقِمِ الصَّلَاةَ

তোমার প্রতি যে কিতাব ওহী করা হয়েছে
তা থেকে পাঠ করো এবং সালাত কায়েম করো।
(আনকাবুত ২৯:৪৫)

এখানে স্পষ্টভাবে দুটি আলাদা নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
প্রথমে কিতাব পাঠ।
তারপর সালাত কায়েম।
আবার আল্লাহ বলেন।

إِنَّ الَّذِينَ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ

নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে
এবং সালাত কায়েম করে। (ফাতির ৩৫:২৯)

এখানেও একই বিষয় দেখা যাচ্ছে।
কুরআন পাঠ এবং সালাত—দুটি আলাদা আমল।

বন্ধুগণ,
এখন আমাদের ভাবতে হবে।
যদি সালাতের মধ্যেই কুরআন পাঠ সীমাবদ্ধ হতো।
তাহলে আলাদা করে কেন বলা হলো।
এখানেই একটি গভীর ইঙ্গিত রয়েছে।
সালাত শুধু তিলাওয়াত নয়।
এটি একটি বৃহত্তর প্রক্রিয়া।

সালাত ছিল একটি সমাবেশ।
একটি যোগাযোগের মাধ্যম।
একটি শিক্ষামূলক পরিবেশ।
যেখানে মানুষ একত্রিত হতো।
কুরআন শুনত। বোঝার চেষ্টা করত।

বন্ধুগণ,
এবং শুধু শুনেই শেষ করত না।
বরং তা জীবনে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিত।
এখন আমরা আরেকটি আয়াত দেখি।

فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّرَ مِنَ الْقُرْآنِ

কুরআন থেকে যতটুকু সহজ হয় ততটুকু পাঠ করো। (মুজাম্মিল ৭৩:২০)

বন্ধুগণ, এই নির্দেশের পরেই সালাতের কথা বলা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে এই দুটি ধাপ আলাদা।
অর্থাৎ কুরআন অধ্যয়ন একটি স্বতন্ত্র বিষয়।
আর সালাত কায়েম একটি প্রয়োগমূলক বিষয়।
এখান থেকেই আমরা বুঝতে শুরু করি।
সালাত মানে শুধু কিছু শারীরিক কাজ নয়।
এটি একটি জীবন্ত প্রক্রিয়া।
এটি শেখা। বোঝা। এবং সংযোগ তৈরি করা।

বন্ধুগণ,
এই সংযোগ শুধু আল্লাহর সাথে নয়।
মানুষের মাঝেও। সমাজের মাঝেও।
তাই সালাতকে যদি আমরা শুধু রিচুয়াল বানিয়ে ফেলি।
তাহলে আমরা এর মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলি।

বন্ধুগন
এখন আমরা বুঝতে চাই
“সালাত” শব্দটির গভীর অর্থ কী।

আরবি ভাষায় “সালাত” শব্দটি সংযোগের ধারণা বহন করে।
এটি কমিউনিকেশন।
এটি মনোযোগ।
এটি সম্পূর্ণভাবে কোনো কিছুর দিকে ঝুঁকে পড়া।
অর্থাৎ সালাত মানে শুধু কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক অঙ্গভঙ্গি নয়।
বরং এটি একটি গভীর সংযোগ।
একটি সচেতন সম্পর্ক।

বন্ধুগণ,
এই সংযোগ কিসের সাথে।
আল্লাহর সাথে। তার বাণীর সাথে।
এবং সেই বাণীর বাস্তবতার সাথে।

এখন আমরা “আকিমুস সালাত” এর দিকে আসি।
এখানে শুধু সালাত আদায়ের কথা বলা হয়নি।
বরং বলা হয়েছে “কায়েম” করতে।

বন্ধুগণ,
“কায়েম” মানে প্রতিষ্ঠা করা।
দাঁড় করানো। বাস্তবায়ন করা।
অর্থাৎ শুধু পড়া নয়।
বরং জীবনে প্রতিষ্ঠা করা।
ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে
সামাজিক জীবনে কার্যকর করা।

এখানেই মূল পার্থক্য। একটি হলো করা।
আরেকটি হলো প্রতিষ্ঠা করা।
আল্লাহ কুরআন দিয়েছেন কেন।
শুধু জানার জন্য নয়।
শুধু তিলাওয়াত করার জন্য নয়।
বরং বাস্তবায়নের জন্য।
এই বিষয়টি আমরা আগেই দেখেছি।

فَمَن تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ

যারা আমার হিদায়াত অনুসরণ করবে
তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিত হবে না। (বাকারা ২:৩৮)

এখানে আবারও “অনুসরণ” শব্দটি এসেছে।
এটাই মূল বিষয়।
কেউ যদি শুধু পড়ে। শুধু জানে।
কিন্তু জীবনে প্রয়োগ না করে।
তাহলে সে হিদায়াতের প্রকৃত উপকার পাবে না।
কারণ কুরআনের উদ্দেশ্য জ্ঞান নয়।
বরং জীবন পরিবর্তন।

এখন আমরা বুঝতে পারি।
সালাত ছিল একটি মাধ্যম।
কুরআন বোঝার মাধ্যম।
সংযোগ স্থাপনের মাধ্যম।

আর “আকিমুস সালাত” ছিল
সেই বোঝাপড়াকে জীবনে প্রতিষ্ঠা করা।
পরিবারে প্রতিষ্ঠা করা। সমাজে প্রতিষ্ঠা করা।

বন্ধুগণ,
এখান থেকেই একটি বিপ্লব শুরু হয়।
একটি পরিবর্তন শুরু হয়।
একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠে।
তাই যদি আমরা শুধু বাহ্যিক দিকেই সীমাবদ্ধ থাকি।
তাহলে আমরা আসল বিষয়টি হারিয়ে ফেলি।
আমাদের সামনে এখন একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। সালাতকে বুঝতে হবে।
এবং তা জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বন্ধুগণ, পরবর্তী পর্বে আমরা দেখবো। এই সালাত কীভাবে বাস্তবে মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলেছিল। এবং কীভাবে একটি সমাজকে বদলে দিয়েছিল।

বন্ধুগণ, 
এখন আমরা দেখি এই বিষয়টি
বাস্তবে মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এনেছিল।

সালাত জিবনে কি পরিবর্তন এনেছিলো?

নবীর যুগে মানুষ শুধু কুরআন শুনত না।
তারা তা বুঝত।
এবং সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবায়ন করত।
ফলে তাদের ব্যক্তিজীবন পরিবর্তিত হয়েছিল।
তাদের পরিবার পরিবর্তিত হয়েছিল।
তাদের সমাজ পরিবর্তিত হয়েছিল।

তারা জানতে পেরেছিল কার হক কী।
বাবা-মায়ের অধিকার কী।
সন্তানের অধিকার কী।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত।
প্রতিবেশীর হক কী।
আত্মীয়তার দায়িত্ব কী।

তারা বুঝেছিল অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা অন্যায়।
মিথ্যা বলা অন্যায়।
গীবত করা অন্যায়।
জুলুম করা অন্যায়।

কারণ কুরআন তাদের সামনে সব স্পষ্ট করে দিয়েছিল। কোন কাজ হালাল।
কোন কাজ হারাম।
কোন কাজ বাধ্যতামূলক।

বন্ধুগণ, আল্লাহ বলেন।

يَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنفِقُونَ قُلِ الْعَفْوَ

তারা জিজ্ঞেস করে কী ব্যয় করবে,
বলো অতিরিক্ত যা আছে তাই। (বাকারা ২:২১৯)

অর্থাৎ তারা শুধু নিজের জন্য বাঁচত না।
অন্যের অধিকার আদায় করত।
অতিরিক্ত সম্পদ দান করত।

বন্ধুগণ,
তারা আত্মশুদ্ধির পথে চলত।

الَّذِي يُؤْتِي مَالَهُ يَتَزَكَّىٰ

যে তার সম্পদ দান করে আত্মশুদ্ধি অর্জনের জন্য।
(লাইল ৯২:১৮)

বন্ধুগণ,
এর ফলে সমাজে একটি ভারসাম্য তৈরি হয়েছিল।
ধনী-গরিবের ব্যবধান কমেছিল।
অন্যায় কমে গিয়েছিল।
কারণ মানুষ শুধু জ্ঞান অর্জন করেনি।
বরং তা বাস্তবে প্রয়োগ করেছে।
এটাই ছিল আকিমুস সালাতের ফল।
এটি শুধু ইবাদত ছিল না।
এটি ছিল একটি সামাজিক বিপ্লব।

বন্ধুগণ,
এখন আমরা আমাদের দিকে তাকাই।
আমরাও কুরআন শুনি।
আমরাও অনেক কিছু জানি।
কিন্তু আমরা বাস্তবায়ন করি না।
আমরা শুনেই থেমে যাই।
আমরা জীবনে তা প্রয়োগ করি না।

এ কারণেই আমাদের জীবনে পরিবর্তন আসে না।
আমাদের পরিবারেও না।
আমাদের সমাজেও না।

বন্ধুগণ,
আমরা সালাতকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি কিছু নির্দিষ্ট অঙ্গভঙ্গিতে।
কিন্তু এর আসল উদ্দেশ্য ভুলে গেছি।
তাই আমরা সেই ফল পাচ্ছি না।
যে ফল সাহাবীরা পেয়েছিল।
যে পরিবর্তন তারা দেখেছিল।

বন্ধুগণ,
এখান থেকেই আমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে।
শুধু শোনা যথেষ্ট নয়।
শুধু জানা যথেষ্ট নয়।
আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে।
আমাদের জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তাহলেই আমরা সেই পরিবর্তনের অংশ হতে পারবো।
যে পরিবর্তন একসময় পুরো সমাজকে বদলে দিয়েছিল।

বন্ধুগণ!
নবীর যুগে মানুষ কুরআন শুনত।
বুঝতো।
এবং তা জীবনে প্রয়োগ করত।
এ কারণেই তাদের জীবনে পরিবর্তন এসেছিল।
তাদের পরিবার বদলে গিয়েছিল।
তাদের সমাজ বদলে গিয়েছিল।
কিন্তু আজ আমরা সেই জায়গায় নেই।
আমরা শুনি কিন্তু বুঝি না।
অথবা বুঝলেও অনুসরণ করি না।

আমরা কুরআনের বাণীকে গুরুত্ব দেই না।
আমরা এক কান দিয়ে শুনি।
আরেক কান দিয়ে বের করে দেই।
এ কারণেই আমাদের জীবনে কোনো বিপ্লব আসে না।
না ব্যক্তিজীবনে। না পরিবারে। না সমাজে।

অথচ আল্লাহ অসংখ্য আয়াতে আমাদের তাগিদ দিয়েছেন। এই কুরআন নিয়ে চিন্তা করতে।
গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে।
এবং তা উপলব্ধি করতে।

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ

তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না।
(মুহাম্মদ ৪৭:২৪)

অর্থাৎ শুধু তিলাওয়াত করলেই হবে না।
বোঝা জরুরি। অনুধাবন করা জরুরি।

বন্ধুগণ,
আমরা আজ সালাতকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি
কিছু বাহ্যিক কাজের মধ্যে।
শুধু উঠা-বসা। শুধু রুকু-সিজদা।
কিন্তু এর ভেতরের উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলেছি।
যে উদ্দেশ্য ছিল পরিবর্তন আনা।
নিজেকে বদলানো। সমাজকে গড়ে তোলা।

বন্ধুগণ,
প্রকৃত “আকিমুস সালাত” মানে হলো আল্লাহর বিধানকে জীবনে প্রতিষ্ঠা করা।
নিজের মধ্যে। পরিবারের মধ্যে। সমাজের মধ্যে।
যখন আমরা কুরআন বুঝে চলি।
তখন আমরা অন্যায় করি না।
কারো হক নষ্ট করি না।
কারো উপর জুলুম করি না।

কারণ আমরা জানি প্রতিটি কাজের হিসাব আছে।
প্রতিটি অন্যায়ের পরিণাম আছে।
কুরআন মানুষের অন্তরকে পরিবর্তন করে।
এটি হৃদয়কে জীবন্ত করে তোলে।
এটি মানুষকে সচেতন করে তোলে।

আল্লাহ বলেন।

وَالَّذِينَ إِذَا ذُكِّرُوا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ لَمْ يَخِرُّوا عَلَيْهَا صُمًّا وَعُمْيَانًا

তাদের প্রতিপালকের আয়াত স্মরণ করিয়ে দিলে
তারা বধির ও অন্ধের মতো আচরণ করে না।
(ফুরকান ২৫:৭৩)

অর্থাৎ তারা শোনে। বোঝে। এবং গ্রহণ করে।

বন্ধুগণ,
এখন শেষ প্রশ্নটি আমাদের নিজেদের জন্য।
আমরা কি সেই মানুষের দলে থাকতে চাই।
যারা শুধু শুনে।
নাকি তাদের দলে থাকতে চাই যারা বুঝে এবং অনুসরণ করে।

সিদ্ধান্ত আমাদের।
পথও আমাদের সামনে পরিষ্কার।
তাই আজ থেকেই আমরা একটি অঙ্গীকার করি।
কুরআন পড়বো। বোঝার চেষ্টা করবো।
এবং জীবনে বাস্তবায়ন করবো।

বন্ধুগণ,
আমরা আমাদের সালাতকে জীবন্ত করবো।
এটিকে শুধু রিচুয়াল রাখবো না।
এটিকে আমাদের জীবনের চালিকাশক্তি বানাবো।
তখনই আমাদের জীবনে পরিবর্তন আসবে।
পরিবারে আসবে শান্তি। সমাজে আসবে ইনসাফ।
এবং তখনই আমরা সত্যিকার অর্থে
হিদায়াতের পথে চলতে পারবো।
তখনই আমরা আল্লাহর নিকটবর্তী হতে পারবো।
তখনই আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত সফলতার পথে এগিয়ে যাবো।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে কুরআন বুঝে
অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন।
আমাদের সালাতকে অর্থবহ করে তুলুন।
এবং আমাদের জীবনকে হিদায়াতের আলোয় আলোকিত করুন।
রবনানা তাকব্বাল দুআ

Post a Comment

0 Comments