রমাদান চলে গেল,
কিন্তু কুরআন কোথায়?
সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।
সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি মানুষের জন্য কুরআন নাযিল করেছেন।
সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি মানুষকে বুদ্ধি দিয়েছেন, বিবেক দিয়েছেন, চিন্তা করার ক্ষমতা দিয়েছেন।
শান্তি বর্ষিত হোক সেই সকল নবীদের প্রতি যারা মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ডেকেছেন।
আমি আজ কথা বলতে আসিনি।
কোন বক্তব্যও দিবনা
বক্তব্য অনেক হয়েছে,
ওয়াজ অনেক শুনেছ
এখন প্রশ্ন করার পালা
আমি আজ প্রশ্ন করতে এসেছি।
আমি কোন অভিযোগ করবোনা।
সারা রমজান মাস জুড়ে তুমি সাহরীর ডাক শুনেছ
মসজিদের মাইক থেকে তোমাকে ডাকা হয়েছে
সেই ডাকে সাড়া দিয়ে প্রতিদিন সাহরী খেয়েছ
সারাদিন না খেয়ে রোজাও রেখেছ
কিন্তু আজ তোমার বিবেককে ডাকবো,
তোমার বিবেককে প্রশ্ন করবো।
বল তো—
এই রমাদান মাস কিসের মাস?
আল্লাহ বলেন—
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ
রমাদান মাস সেই মাস
যে মাসে নাযিল হয়েছে কুরআন।
যা মানবজাতির জন্য হেদায়াত।
রমজান হেদায়াতের মাস।
রমজান কুরআনের মাস।
রমজান চিন্তার মাস।
রমজান জাগরণের মাস।
তুমি এই কথাগুলো মসজিদের মিম্বর থেকে শুনেছ
ইমাম সাহেব তোমাকে ওয়াজ শুনিয়েছে
এই মাসে কুরআন নাজিল হয়েছিল
তা তোমাকে ব্যাক্ষা করে বুঝিয়েছে।
এজন্য মাস শেষে তুমি তাকে বিনিময় দিয়েছ
তার পকেট ভর্তি করে দিয়ে খুশি করেছ
কিন্তু এবার আমার প্রশ্নের জবাব দাও—
এই মাসে কী করলে?
মসজিদ ভরেছে।
মাইকে তিলাওয়াত হয়েছে।
রাতভর তারাবি হয়েছে।
কিন্তু বল—
কুরআন কোথায় গেলো?
ওয়াজ শুনলে, নামাজ পড়লে,
সাহরী খেলে, তারাবী পড়লে,
এখন সেমাইও খাবে
ঈদের দিন কোর্মা পলাও খেয়ে ঢেকুরো তুলবে।
কিন্তু এই হেদায়েতের শেষ হল
কুরআনের মাস চলে গেলো
কিন্তু কুরআন কোথায় গেলো?
এ মাসে সম্পুর্ণ কুরআন বুঝে বুঝে পাঠ করেছ কি?
এক পাড়া বুঝে বুঝে পড়েছ?
সব বাদ দিলাম
অন্তত একটি সুরা?
তার মর্ম বুঝে পাঠ করেছ?
তুমি তাহলে পাঠ করনি
কেউ পাঠ করেছে তার নিকটে বসে শুনেছ নিশ্চই?
ও এটাও করনি?
আচ্ছা তুমি করনি, তোমার পরিবার কি করেছে কি?
তোমার সমাজের লোকেরা করেছে কি?
তুমি জাননা? তাহলে তাদের জিজ্ঞেস করে দেখ?
আহা! কি কষ্টের কথা
হেদায়েতের মাস পেলে কিন্তু হেদায়েত পেলেনা,
কুরআনের মাস পেলে কিন্তু কুরআন পেলেনা,
তাহলে তোমাকে কি বলবো?
আমার কথার জবাব দাও
তোমার বিবেককে প্রশ্ন করছি
কুরআন কোথায় গেলো জবাব দাও?
বন্ধুগণ!
আজ মাইকে কুরআনের তিলাওয়াত আছে।
কিন্তু কুরআনের তাদাব্বুর নেই।
কুরআনের গবেষণা নাই।
আজ কুরআনের সুর আছে।
কিন্তু কুরআনের শিক্ষা নেই।
আজ কুরআনের খতম আছে।
কিন্তু কুরআনের উপলব্ধি নেই।
বন্ধুগণ!
আজ আমরা কুরআন পড়ি সুরে।
কুরআন পড়ি প্রতিযোগিতায়।
কুরআন পড়ি অনুষ্ঠানে।
কিন্তু কুরআন পড়ি না বুঝে বুঝে।
আল্লাহ প্রশ্ন করেন—
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ
তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা করে না?
বন্ধুগণ!
এই প্রশ্ন আজও আকাশে ভাসছে।
আমরা কি উত্তর দিয়েছি?
আজ কুরআনের নামে ব্যবসা আছে।
কেউ কুরআনের আয়াত লিখে তাবিজ বানায়।
কেউ কুরআনের খতম বিক্রি করে।
কেউ কুরআনের সুরে মানুষের মন জয় করে।
কেউ কুরআন দিয়ে অলৌকিকতার গল্প বানায়।
কেউ কুরআন দিয়ে অনুষ্ঠান সাজায়।
কিন্তু কুরআনের শিক্ষা কোথায়?
বন্ধুগণ!
আজ আমরা কুরআনকে বানিয়েছি অনুষ্ঠান।
আমরা কুরআনকে বানিয়েছি শিল্প।
আমরা কুরআনকে বানিয়েছি প্রতিযোগিতা।
কিন্তু কুরআন তো নাযিল হয়েছে পথ দেখানোর জন্য।
আল্লাহ বলেন—
هُدًى لِّلنَّاسِ
মানুষের জন্য হেদায়েত।
বন্ধুগণ!
হেদায়েত মানে পথ।
হেদায়েত মানে দিকনির্দেশনা।
কিন্তু আমরা কী করেছি?
আমরা পথ ছেড়ে অনুষ্ঠান ধরেছি।
আমরা দিকনির্দেশনা ছেড়ে আবেগ ধরেছি।
বন্ধুগণ!
আজ রমাদানের রাতগুলো দেখুন।
মসজিদে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
রাকাতের পর রাকাত পড়ছে।
কিন্তু কেউ জানে না কী পড়া হচ্ছে।
দ্রুত তিলাওয়াত হচ্ছে।
দ্রুত রুকু হচ্ছে।
দ্রুত সিজদা হচ্ছে।
মনে হচ্ছে শরীর চর্চা ভালোই হচ্ছে
কিন্তু কুরআন বোঝা নেই।
বন্ধুগণ!
এ কেমন কুরআনের মাস?
এ কেমন হেদায়েতের মাস?
রমাদান শেষ হয়ে যাচ্ছে।
চাঁদ দেখা যাবে।
কিন্তু বল—
এ মাসে কি অর্জন করলে?
এই মাসে কুরআনের কতটুকু বুঝলে?
বন্ধুগণ!
একটি জাতি যখন কুরআন পড়ে না
সেই জাতি অন্ধ হয়ে যায়।
একটি জাতি যখন কুরআন বোঝে না
সেই জাতি অনুষ্ঠানপ্রিয় হয়ে যায়।
কারণ অনুষ্ঠান সহজ।
চিন্তা কঠিন।
রাকাত গোনা সহজ।
আয়াত বোঝা কঠিন।
সুর করা সহজ।
তাদাব্বুর করা কঠিন।
বন্ধুগণ!
কুরআন নাযিল হয়েছিল মানুষকে জাগাতে।
কুরআন বলেছিল—
أَفَلَا تَعْقِلُونَ
তোমার কি আক্কেল নাই?
তোমরা কি বুদ্ধি ব্যবহার করো না?
কুরআন বলেছিল—
لَعَلَّكُمْ تَتَفَكَّرُونَ
যেন তোমরা চিন্তা করো।
কুরআন বলেছিল—
لِّقَوْمٍ يَعْقِلُونَ
যারা বুদ্ধি ব্যবহার করে তাদের জন্য।
যাদের আক্কেল আছে কুরআন তাদের জন্য।
বন্ধুগণ!
কুরআন মানুষকে চিন্তা করতে বলেছে।
কিন্তু আমরা চিন্তা হারিয়েছি।
আমরা প্রশ্ন হারিয়েছি।
আমরা কুরআনের দিকে তাকানো হারিয়েছি।
বন্ধুগণ!
আজ একটি কঠিন সত্য বলি।
আজ মুসলিম সমাজে কুরআন আছে
কিন্তু কুরআনের জাতি নেই।
মসজিদ আছে, কিন্তু হেদায়েত নেই।
তিলাওয়াত আছে
কিন্তু বুঝ নাই, উপলব্ধি নেই।
বন্ধুগণ!
কুরআন তাকের উপর আছে।
কিন্তু হৃদয়ে নেই।
কুরআন দেয়ালে আছে।
কিন্তু জীবনে নেই।
কুরআন অনুষ্ঠানে আছে।
কিন্তু চিন্তায় নেই।
বন্ধুগণ!
আজ রমাদান শেষ হতে চলেছে।
এই মাস কুরআনের মাস ছিল।
এই মাস হেদায়েতের মাস ছিল।
এই মাস ছিল কুরআন বোঝার মাস।
কিন্তু আমরা কী করেছি?
আমরা অনুষ্ঠান করেছি।
আমরা সুর শুনেছি।
আমরা খতম গুনেছি।
কিন্তু কুরআন বুঝিনি।
বন্ধুগণ!
এই অবস্থায় একটি প্রশ্ন জেগে ওঠে—
আমরা কি সত্যিই কুরআনের উম্মাহ?
নাকি আমরা কুরআনের অনুষ্ঠানকারী?
আমি আজ একটি আহ্বান রেখে যেতে চাই।
কুরআনের কাছে ফিরে আসুন।
সুরের জন্য নয়।
অনুষ্ঠানের জন্য নয়।
বোঝার জন্য।
কুরআন পড়ুন।
আয়াত পড়ুন।
অর্থ বোঝার চেষ্টা করুন।
কারণ কুরআন বোঝা ছাড়া ধর্ম নাই।
কুরআন বোঝা ছাড়া ঈমান জাগে না।
কুরআন বোঝা ছাড়া মুসলিম জাতি জাগে না।
বন্ধুগণ!
রমাদান শেষ হয়ে যাবে।
চাঁদ উঠবে। ঈদ হবে।
কিন্তু আমার প্রশ্ন থেকে গেল—
এই মাসে
আমরা কি কুরআন বুঝলাম?
নাকি শুধু অনুষ্ঠান করলাম?
হুজুর না হয় টাকা অর্জন করলো,
কিন্তু আমরা কি অর্জন করলাম?
বন্ধুগণ!
মনে রাখবে—
যে জাতি কুরআন বুঝে
সেই জাতি জেগে ওঠে।
আর যে জাতি কুরআনকে অনুষ্ঠান বানায়
সে জাতি ইতিহাসের ভিড়ে হারিয়ে যায়।
আল্লাহ আমাদের বুঝদান করুন।
রব্বানা তাকব্বাল দুআ।

0 Comments