Subscribe Us

উদ্দেশ্য হল তাকওয়া, পথ হল সাওম

 উদ্দেশ্য হল তাকওয়া, পথ হল সাওম


লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ

আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল ‘আলামীন।
আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী খালাকাস্ সামাওয়াতি ওয়াল আরদ।
আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী আনযালা ‘আলা ‘আব্দিহিল কিতাব।
আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী খালাকাল ইনসান, আল্লামাহুল বায়ান।
সালামুন আলা মুহাম্মাদ আল্লাযি যা'য়া বিল কুরআনি মুহাইমিনা।
ও সালামুন আলাল মুরসালিন, আল্লাযিনা কানু হুদান ওয়া রহমাতান লিন্নাস।
রব্বী আউযুবিকা মিন হামাযাতিশ্ শায়াতিন।
ওয়া আউযুবিকা আন ইয়াহদুরূন।
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।
রব্বিশ রহলি ছদরী।
ওয়া ইয়াস্সিরলী আমরী।
ওয়াহলুল উকদাতাম মিল লিসানী।
ইয়াফকাহু কওলী।

বন্ধুগণ!
আজকের আলোচ্য বিষয় হল- সিয়াম লক্ষ্য উদ্দেশ্য হল তাকওয়া, আর পদ্ধতী ও পথ হলো সাওম।

আমরা প্রথমে সাওমের মানজিল বুঝব।
তারপর “কুতিবা” ও “ফারাদা”–এর ভারসাম্য বুঝব।
তারপর “সুন্নাতুল্লাহ”–এর সঠিক অর্থ স্পষ্ট করব।

বন্ধুগণ!
ইবাদাতের একটি বাহ্যিক রূপ আছে।
এই বাহ্যিক রুপকে অস্বীকার করে মুল লক্ষ্য অর্জন করা যায়না।
আবার ইবাদাতের একটি অন্তর্গত মানজিলও আছে।
আর এটিই হলো সেই ইবাদতের আসল, এটিমুল,
এটি লক্ষ্য,  এটিই আসল ফলাফল।
এখন বুঝতে হবে,
যদি আমরা শুধু বাহ্যিক রূপ বা কাঠামোতে আটকে যাই,
তাহলে মানজিলে কখনোই পৌঁছাতে পারবো না।

এখন আসল কথা হলো মনজিলে মনজিলে পৌছুতে হবে।
মনজিলে যদি পৌছুতে হয় তাহলে সাওমের বাহ্যিক রুপ বা কাঠামো ছাড়াও পৌছানো সম্ভব নয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
(সূরা আল-বাকারা : ১৮৩)
তোমাদের ওপর সাওম নির্ধারিত হয়েছে। যেমন নির্ধারিত হয়েছিল পূর্ববর্তীদের ওপর। যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করো।

বন্ধুগণ!
এখানে লক্ষ্য স্পষ্ট—
لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করো।

তাকওয়া মানে শুধু ভেতরের অনুভূতি নয়।
তাকওয়া মানে আল্লাহকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
তাকওয়া মানে গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহর সীমা মেনে চলা।
তাকওয়া মানে সুযোগ থাকলেও আল্লাহর অবাধ্য না হওয়া।

সাওমের মানজিল ক্ষুধায় কষ্ট করা নয়।
সাওমের মানজিল পিপাসায় কষ্ট পাওয়া নয়।
সাওমের মানজিল সামাজিক ঐতিহ্য নয়।
সাওমের মানজিল হল তাকওয়া।

কিন্তু তাকওয়া আকাশ থেকে নেমে আসে না।
তাকওয়া কল্পনার মাধ্যমে তৈরি হয় না।
তাকওয়া শুধু আবেগ দিয়ে জন্মায় না।

তাকওয়া তৈরী হয় ট্রেনিং এর মাধ্যমে,
তাকওয়া তৈরি হয় গভীর অনুশীলনের মাধ্যমে।
তাকওয়া তৈরি হয় নিয়মিত সংযমের মাধ্যমে।
তাকওয়া তৈরি হয় নির্ধারিত সীমা মানার অভ্যাস থেকে।

এখানে একটি মৌলিক নীতি আছে।
ভোর থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত পানাহার ও যাবতীয় মন্দকাজ বর্জন করাটা বাহ্যিক ইবাদত।
আর ইবাদাত হল মাধ্যম।
তাকওয়া লক্ষ্য।
লক্ষ্যে পৌঁছাতে মাধ্যমকে বাতিল করা যায় না।

যেমন ডাক্তার হওয়া লক্ষ্য।
কিন্তু মেডিকেল বই না পড়ে ডাক্তার হওয়া যায় না।
অপারেশন থিয়েটারে দাঁড়ানোর আগে বছরের পর বছর প্রশিক্ষণ লাগে।
কেউ যদি বলে—
“আমার উদ্দেশ্য মানুষকে সুস্থ করা, তাই পড়াশোনার দরকার নেই”—
তবে সে লক্ষ্যকেই নষ্ট করছে।

তুমি যদি মনে কর তোমার উদ্দেশ্যই আসল,
তুমি রোগীকে সুস্থ করবে এটাই তোমার লক্ষ্য,
এজন্য তুমি বাহ্যিক নিয়মের ধার ধারণা,
ডাক্তারি না পড়েই ডাক্তার হবে,
প্রশিক্ষণ না দিয়েই রোগীর সার্জারী করবে,
তাহলে তোমার দারা রোগীর মৃত্যু ছাড়া সুস্থতার আশা করা বোকামী ছাড়া কিছুইনা।

তোমার চিন্তা যদি সত্যিই এমন হয়,
তাহলে সর্বপ্রথম তোমারি চিকিতসা প্রয়োজন।
তুমি মানসিকাবে অসুস্থ।
আর মানুষ এত বোকা নয় যে,
তোমার মত প্রশিক্ষণহীন ভুয়া ডাক্তারের নিকট,
তাদের রোগীকে সোপর্দ করবে।

তেমনি একজন খেলোয়াড় চ্যাম্পিয়ন হতে চায়।
তার লক্ষ্য হল ট্রফি জেতা।
সে বিজয়ী হয়ে মেডেল পেতে চায়,
তার লক্ষ্য হল মেডেল লাভ করা।
কিন্তু সে রিহার্সাল করতে চায়না, প্রশিক্ষণ নিতে চায়না,
কিন্তু অনুশীলন বাদ দিলে কি ট্রফি আসে?
ট্রেনিং না করে কি খেলায় জেতা সম্ভব?
ঘাম ছাড়া কি শক্তি তৈরি হয়?
ডায়েট বা নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কি ফিটনেস আসে?

বন্ধুগণ!
সাওম হল তাকওয়ার ট্রেনিং,
সাওম হলো তাকওয়ার অনুশীলন।
দিনের বেলায় কেউ দেখছে না।
কেউ জানে না আপনি একা ঘরে কী করছেন।
পানি সামনে আছে।
খাবার সামনে আছে।
তবুও আপনি নিজেকে থামাচ্ছেন।

কেন থামান?
কারণ আল্লাহ দেখছেন।

এই মুহূর্তেই তাকওয়ার জন্ম হয়।
এই মুহূর্তেই অন্তরের ভেতরে আল্লাহসচেতনতা শক্ত হয়।

যদি কেউ বলে—
“তাকওয়াই আসল, তাই যত খাও সমস্যা নাই”—
তাহলে সে প্রশিক্ষণ বাদ দিয়ে সার্টিফিকেট চায়।
সে গাছ না লাগিয়েই ফল খেতে চায়,
সে প্রশিক্ষণ ছাড়া মেডেল চায়।
সে মাধ্যম ছাড়াই মানজিল চায়।

বন্ধুগণ!
তাকওয়া শুধু অনুভূতির নাম নয়।
তাকওয়া সীমা মেনে চলার নাম।
আল্লাহ যদি বলেন—
ফজর থেকে রাত পর্যন্ত পানাহার বর্জন করো,
তবে সেই বর্জনের মধ্যেই তাকওয়ার অনুশীলন।

একজন মানুষ রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
সে বলে— “আমি ধৈর্যশীল হতে চাই।”
কিন্তু যখন রাগ আসে, সে নিজেকে থামায় না।
তাহলে কি ধৈর্য তৈরি হয়?
তেমনি একজন মানুষ আল্লাহভীরু হতে চায়।
কিন্তু আল্লাহর নির্ধারিত বিধানকে হালকা করে দেখে।
তাহলে কি তাকওয়া জন্মায়?

বন্ধুগণ!
সাওম হলো নফসকে নিয়ন্ত্রণ করার স্কুল।
এটি এক মাসের প্রশিক্ষণ শিবির।
এখানে মানুষ শেখে—
আমি চাইলে খেতে পারি।
আমি চাইলে পান করতে পারি।
কিন্তু আল্লাহর নির্দেশে আমি নিজেকে থামাই।
এই থামানোই তাকওয়ার বীজ।
এই সংযমই তাকওয়ার মূল।
এই নিয়ন্ত্রণই তাকওয়ার ভিত্তি।

তাই মনে রাখতে হবে— তাকওয়া লক্ষ্য।
সাওম তার প্রশিক্ষণ।
তাকওয়া মানজিল- সাওম তার পথ।
পথ ছাড়া মানজিল নেই।
মাধ্যম ছাড়া লক্ষ্য অর্জন হয় না।
আল্লাহ নির্ধারিত সাওম ছাড়া তাকওয়ার প্রকৃত প্রশিক্ষণ হয় না।

বন্ধুগণ!
এখন আসি “কুতিবা” প্রসঙ্গে।
কেউ বলেন— আয়াতে “ফরজ” শব্দ নেই।
আয়াতে “কুতিবা” আছে। অতএব সাওম ফরজ নয়।
কুরআনের ভাষা বুঝতে হবে।
আল্লাহ বলেন—
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ
(সূরা আল-বাকারা : ২১৬)
তোমাদের ওপর যুদ্ধ নির্ধারিত হয়েছে।
এটি কি নফল? না।
আল্লাহ বলেন—
كُتِبَ عَلَيْكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ
(সূরা আল-বাকারা : ১৮০)
মৃত্যুর সময় ওসিয়তের বিধান নির্ধারিত হয়েছে।
অতএব “কুতিবা” কুরআনিক পরিভাষায় বাধ্যতামূলক নির্ধারণ।
অন্যদিকে আল্লাহ বলেন—
إِنَّ الَّذِي فَرَضَ عَلَيْكَ الْقُرْآنَ
(সূরা আল-কাসাস : ৮৫)
যিনি আপনার ওপর কুরআন ফরজ করেছেন।

বন্ধুগণ!
“ফারাদা” এসেছে।
“কুতিবা” এসেছে। দুটিই নির্ধারণ বোঝায়।
জি! কুরআন ফরজ।
কুরআনই সাওম নির্ধারণ করেছে।
কুরআনই সালাত নির্ধারণ করেছে।
কুরআনই যাকাত নির্ধারণ করেছে।
অতএব “কুরআন ফরজ, তাই সাওম আলাদা ফরজ নয়”—
এই যুক্তি কুরআনের সামগ্রিক বয়ানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বন্ধুগণ!
এখন আসি পূর্ববর্তীদের সাওম প্রসঙ্গে।
আয়াতে এসেছে—
كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ
যেমন নির্ধারিত হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর।
এখানে সাদৃশ্য আছে।
কিন্তু অভিন্নতা নেই।
পূর্ববর্তীদের ওপরও সাওম ছিল।
কিন্তু তাদের রূপ, সময়, পদ্ধতি এক ছিল—এমন দাবি করা যায় না।
কারণ আল্লাহ বলেন—
لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا
(সূরা আল-মায়েদা : ৪৮)
প্রত্যেক উম্মতের জন্য আলাদা শরীয়াহ ও পথ নির্ধারণ করা হয়েছে।

বন্ধুগণ!
দ্বীনের মূলনীতি পরিবর্তন করা যায়না, পরিবর্তন হয়না।
তাওহিদ পরিবর্তন হয়না।
রিসালাত পরিবর্তন হয়না।
আখিরাত পরিবর্তন হয়না।
কিন্তু শরীয়াহর শাখাগত বিধানের পরিবর্তন হয়েছে।
আল্লাহ বলেন—
وَعَلَى الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا كُلَّ ذِي ظُفُرٍ
(সূরা আল-আনআম : ১৪৬)
ইহুদিদের জন্য কিছু জিনিস হারাম করা হয়েছিল।
আমাদের জন্য তা হালাল।
এতে কি আল্লাহর সার্বভৌমত্বে পরিবর্তন হয়েছে?
না।
কিন্তু শরীয়াহর বিধানে প্রেক্ষাপটভিত্তিক পরিবর্তন হয়েছে।

বন্ধুগণ!
এখন চল “সুন্নাতাল্লাহ” প্রসঙ্গে।
আল্লাহ বলেন—
فَلَن تَجِدَ لِسُنَّتِ اللَّهِ تَبْدِيلًا
(সূরা ফাতির : ৪৩)
তুমি আল্লাহর সুন্নাতে কোনো পরিবর্তন পাবে না।

এখানে “সুন্নাতাল্লাহ” কী?
এটি শরীয়াহর খুঁটিনাটি বিধান নয়।
এটি আল্লাহর স্থায়ী নীতি।
এটি ইতিহাসে আল্লাহর কর্ম পদ্ধতি।
অবাধ্যতা = শাস্তি। ঈমান = মুক্তি।

সালামুন আলা নূহ।
তার কওম অস্বীকার করল। ফলে— তারা ধ্বংস হল।
সালামুন আলা মূসা।
ফিরআউন অস্বীকার করল। ফলে— সে ডুবে গেল।
এটাই সুন্নাতুল্লাহ। এটি পরিবর্তিত হয় না।
কিন্তু শরীয়াহর বিধান যুগভেদে পরিবর্তিত হয়েছে।

বন্ধুগণ!
এখন আসি মরিয়াম (আ.)–এর সাওমে।
আল্লাহ বলেন—
إِنِّي نَذَرْتُ لِلرَّحْمَٰنِ صَوْمًا فَلَنْ أُكَلِّمَ الْيَوْمَ إِنسِيًّا
(সূরা মারইয়াম : ২৬)
আমি রহমানের জন্য সাওমের মানত করেছি। আজ আমি কারও সাথে কথা বলব না।

এখানে সাওম মানে নীরবতা। এটি তাদের শরীয়াহ।
কিন্তু আমাদের শরীয়াহ কী বলে?
আল্লাহ বলেন—
وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ
(সূরা আল-বাকারা : ১৮৭)
তোমরা খাও ও পান করো, যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা স্পষ্ট হয়।
তারপর—
ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ
(সূরা আল-বাকারা : ১৮৭)
তারপর রাত পর্যন্ত সাওম পূর্ণ করো।

বন্ধুগণ!
এখানে স্পষ্টভাবে পানাহার বর্জন নির্ধারিত হয়েছে।
অতএব সালামুন আলা মরিয়াম– সিয়ামের বিধান মান্য করেছেন,
আমরাও সিয়াম পালন করবো,
মরিয়ম তার শরিয়ায় চুপ থাকার সিয়াম পালন করেছেন,
আমরা আমাদের শরিয়ায় পানাহার বর্জন করবো,
আমাদের শরিয়া নির্ধারিত হয়েছে স্পষ্ট আয়াতে।
আংশিক আয়াত দিয়ে সার্বিক বিধান তৈরি করা বিপজ্জনক।
লক্ষ্যকে সামনে এনে মাধ্যমকে বাতিল করা ভুল।
আল্লাহ বলেন—
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ
(সূরা আল-বাকারা : ৮৫)
তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আনো, আর কিছু অংশ অস্বীকার করো?

বন্ধুগণ!
দ্বীন সম্পূর্ণ গ্রহণ করতে হয়।
আংশিক গ্রহণে বিভ্রান্তি আসে।
সাওম শুধু না খাওয়া নয়।
কিন্তু না খাওয়াটাও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তাকওয়া শুধু অনুভূতি নয়।
আল্লাহর নির্ধারিত সীমা মানাই তাকওয়া।

সাওমের মানজিল তাকওয়া।
কিন্তু সেই মানজিলে পৌঁছাতে হলে আল্লাহর নির্ধারিত পথেই চলতে হবে।
এটাই ভারসাম্য।
এটাই কুরআনিক পদ্ধতি।
এটাই সঠিক বোঝাপড়া।

সিয়ামের এই মাসে
আপনাদের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ কামনা করে শেষ করছি।
সালামুন আলাইকুম রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ। 

Post a Comment

0 Comments