সিয়াম কি একমাস নাকি কয়েকদিন?
লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ
আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল ‘আলামীন।
আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী খালাকাস্ সামাওয়াতি ওয়াল আরদ।
আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী আনযালা ‘আলা ‘আব্দিহিল কিতাব।
আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী খালাকাল ইনসান, আল্লামাহুল বায়ান।
সালামুন আলা মুহাম্মাদ আল্লাযি যা'য়া বিল কুরআনি মুহাইমিনা।
ও সালামুন আলাল মুরসালিন, আল্লাযিনা কানু হুদান ওয়া রহমাতান লিন্নাস।
রব্বী আউযুবিকা মিন হামাযাতিশ্ শায়াতিন।
ওয়া আউযুবিকা আন ইয়াহদুরূন।
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।
রব্বিশ রহলি ছদরী।
ওয়া ইয়াস্সিরলী আমরী।
ওয়াহলুল উকদাতাম মিল লিসানী।
ইয়াফকাহু কওলী।
বন্ধুগণ!
প্রশ্ন উঠেছে—
আল্লাহ যখন বলেন “যেমনটি তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ছিল”,
তখন কি পূর্ববর্তীরাও এক মাস সিয়াম পালন করত?
এই প্রশ্নের উত্তর কুরআনের ভেতরেই আছে।
প্রথমে একটি মৌলিক নীতি বুঝতে হবে।
কুরআন যখন পূর্ববর্তী জাতির কথা বলে,
তা শিক্ষা হিসেবে বলে।
সতর্কতা হিসেবে বলে।
ধারাবাহিকতা বোঝাতে বলে।
কিন্তু কোথাও বলেনি—
পূর্ববর্তী জাতির আমলই পরবর্তী জাতির ফরজ নির্ধারণ করবে।
বরং আল্লাহ স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন—
لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا
(সূরা আল-মায়েদা : ৪৮)
তোমাদের প্রত্যেকের জন্য আমরা নির্ধারণ করেছি আলাদা শরিয়ত ও পথ।
বন্ধুগণ!
এই আয়াত একাই বিতর্কের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
প্রত্যেক উম্মতের শরিয়ত আলাদা।
প্রত্যেক উম্মতের কাঠামো আলাদা।
প্রত্যেক উম্মতের সময় ও বিধান আলাদা।
অতএব পূর্ববর্তীদের আমল আমাদের ফরজ নির্ধারণ করে না।
এখন ফিরে আসি মূল আয়াতে।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ
كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ
لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
(সূরা আল-বাকারা : ১৮৩)
তোমাদের ওপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে।
যেমনটি ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর।
যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করো।
বন্ধুগণ!
এখানে “كما” শব্দটি এসেছে।
এই শব্দটি উদ্দেশ্যের মিল বোঝায়।
পদ্ধতির হুবহু মিল বোঝায় না।
এখানে লক্ষ্য তাকওয়া।
এখানে লক্ষ্য আত্মসংযম।
এখানে লক্ষ্য আল্লাহসচেতনতা।
মানুষ নতুন ফরজকে ভয় পায়।
বিশেষ করে দেহসংক্রান্ত কষ্টের ইবাদতকে।
সিয়াম সহজ নয়।
ক্ষুধা আছে।
তৃষ্ণা আছে।
সংযম আছে।
তাই কুরআন বলেছে—
তোমরা প্রথম নও।
তোমাদের আগেও মানুষ এই শিক্ষা পেয়েছে।
এটি মানবজাতির পরীক্ষিত নৈতিক অনুশীলন।
বন্ধুগণ!
পরীক্ষিত শিক্ষা আর অভিন্ন আইন এক জিনিস নয়।
নৈতিক ধারাবাহিকতা আর আইনগত অনুকরণ এক নয়।
এখন প্রশ্ন—
পূর্ববর্তীরা কারা?
সালামুন আলা নূহ।
সালামুন আলা ইবরাহীম।
সালামুন আলা মূসা।
সালামুন আলা দাউদ।
সালামুন আলা ঈসা।
এরা সবাই পূর্ববর্তী।
তাদের সময় আলাদা।
তাদের সমাজ আলাদা।
তাদের ক্যালেন্ডার আলাদা।
তাদের বাস্তবতা আলাদা।
কেউ যদি দাবি করে—
পূর্ববর্তীরা এক মাস সিয়াম পালন করত,
তাহলে তাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে—
কোন পূর্ববর্তী?
কোন যুগ?
কোন ক্যালেন্ডার?
কোন ভৌগোলিক অঞ্চল?
ইতিহাস একক উত্তর দেয় না।
ইহুদি ঐতিহ্যে নির্দিষ্ট দিনের উপবাস আছে।
খ্রিস্টানদের মৌসুমি উপবাস আছে।
আরও প্রাচীন জাতির সংযম-পদ্ধতি ভিন্ন।
কোথাও এক মাস ধারাবাহিক খাদ্য-বিরতির সার্বজনীন প্রমাণ নেই।
বন্ধুগণ!
কুরআন ইতিহাসের বিশৃঙ্খল বাস্তবতাকে আইন বানায়নি।
কুরআন আমাদের জন্য নতুন কাঠামো দিয়েছে।
স্পষ্ট কাঠামো।
নির্দিষ্ট কাঠামো।
আল্লাহ বলেন—
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ
فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ
(সূরা আল-বাকারা : ১৮৫)
রমযান মাস।
যে এই মাস উপস্থিত পাবে, সে যেন এতে সিয়াম পালন করে।
বন্ধুগণ!
এখানে সময় নির্ধারণ স্পষ্ট।
রমযান মাস।
কয়েকদিন নয়।
অনির্দিষ্ট নয়।
অস্পষ্ট নয়।
যদি পূর্ববর্তীদের সময়কালই মানদণ্ড হতো,
তাহলে কুরআন নতুন করে সময় নির্ধারণ করত না।
কিন্তু কুরআন নির্ধারণ করেছে।
এটি আইন।
এটি আল্লাহর সিদ্ধান্ত।
বন্ধুগণ!
কুরআন ইতিহাসকে অস্পষ্ট রাখতে পারে।
কিন্তু আইনকে অস্পষ্ট রাখে না।
আইন স্পষ্ট।
সময় স্পষ্ট।
কাঠামো স্পষ্ট।
এখন কেউ যদি বলে—
“পূর্ববর্তীরা এক মাস রাখেনি, তাই আমাদেরও এক মাস হওয়া উচিত নয়”—
তবে সে কুরআনের কর্তৃত্বকে ইতিহাসের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলছে।
অথচ কুরআনের কর্তৃত্ব আল্লাহর নির্দেশ থেকে আসে।
মানুষের অভ্যাস থেকে নয়।
আরও লক্ষ্য করুন—
১৮৩ আয়াত প্রস্তুতি দেয়।
১৮৪ আয়াত বিকল্প ও ব্যাখ্যা দেয়।
১৮৫ আয়াত চূড়ান্ত কাঠামো দেয়।
কুরআন নিজেই নিজের ব্যাখ্যা দেয়।
আয়াতের এক অংশ টেনে এনে অন্য অংশকে বাতিল করা যায় না।
বন্ধুগণ!
পূর্ববর্তীদের উল্লেখ মানসিক প্রস্তুতি।
আইন নয়।
নৈতিক ধারাবাহিকতা।
হুবহু কাঠামো নয়।
সিয়াম আমাদের জন্য এক মাস।
কারণ আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন।
এই বিধান দাঁড়িয়ে আছে কুরআনের ঘোষণার ওপর।
পূর্ববর্তী জাতির অভ্যাসের ওপর নয়।
আল্লাহ বলেন—
وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ
مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ
وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ
(সূরা আল-মায়েদা : ৪৮)
আমরা আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি সত্যসহ।
পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যকে সমর্থনকারী।
এবং তার উপর প্রভাবশালী।
বন্ধুগণ!
এই কিতাব “মুহাইমিন”।
তত্ত্বাবধায়ক।
চূড়ান্ত মানদণ্ড।
নির্ণায়ক।
অতএব সিয়ামের এই মাস কোনো ঐতিহাসিক অনুকরণ নয়।
এটি আল্লাহপ্রদত্ত স্বতন্ত্র বিধান।
এটি স্পষ্ট ঘোষণাভিত্তিক আইন।
এটি তাকওয়ার প্রশিক্ষণ।
সিয়াম এক মাস।
কারণ কুরআন ঘোষণা করেছে।
সিয়াম রমযানে।
কারণ আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন।
এটাই কুরআনের ভাষা।
এটাই শরিয়তের ভিত্তি।
এটাই মুমিনের মানদণ্ড।
0 Comments