Subscribe Us

সিয়াম নিয়ে বিভ্রান্তি : কুরআনের বক্তব্য বনাম আধুনিক দাবি

 সিয়াম নিয়ে বিভ্রান্তি : কুরআনের বক্তব্য বনাম আধুনিক দাবি


বন্ধুগণ,
আজ আমরা এমন এক সময় পার করছি,
যখন ইসলামের মৌলিক ইবাদতগুলো নিয়েও মানুষ সন্দেহ ছড়াচ্ছে।
কেউ বলছে—এক মাস সিয়াম কুরআনে নেই।
কেউ বলছে—মাত্র তিন দিন।
কেউ বলছে—সাত দিন,
কেউ আবার হজের দশ দিনের সিয়াম টেনে এনে বলছে, “এইটাই আসল সিয়াম।”
আবার কেউ আরও এক ধাপ এগিয়ে বলছে—
মরিয়মের সিয়াম, যাকারিয়ার সিয়াম, মুসার সিয়াম—এইগুলোই আসল, রমজানের সিয়াম নাকি বানানো বিষয়।
এমনকি কেউ কেউ সরাসরি বলছে—সিয়ামই নাই।

এই কথাগুলো দ্বারা সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে।
তাই আজ আবেগ দিয়ে নয়, গালাগালি দিয়ে নয়—
কুরআনের ভাষায়,
কুরআনের যুক্তিতে জবাব দেওয়া জরুরি।
কারণ সত্য কখনো চিৎকার করে না; সত্য দাঁড়িয়ে থাকে দলিলের ওপর।

প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে—
কুরআনে “সিয়াম” বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কুরআন নিজেই শব্দটা ব্যবহার করেছে কি না?
যদি করে থাকে, কোথায়, কীভাবে, কোন প্রেক্ষাপটে? কুরআন ছাড়া অন্য কোনো গ্রন্থ দিয়ে আমরা এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে পারি না।

আল্লাহ কুরআনে বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে” (সূরা বাকারা ২:১৮৩)

বন্ধুগণ,
এই আয়াত দিয়ে সব সন্দেহের প্রথম দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়।
কারণ এখানে আল্লাহ স্পষ্ট করে বলছেন—
সিয়াম ফরজ করা হয়েছে।
কেউ যদি বলে “সিয়ামই নাই”—সে সরাসরি কুরআনের বক্তব্য অস্বীকার করছে।
এখন প্রশ্ন আসে—এই সিয়াম কতদিনের?
এক মাস, তিন দিন, না কি দশ দিন?

বন্ধুগণ,
আয়াতটি এখানেই থেমে যায়নি।
আল্লাহ সঙ্গে সঙ্গে যোগ করেছেন—
كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ
“যেমনটি তোমাদের আগের লোকদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল” (বাকারা ২:১৮৩)

এই অংশ ধরেই অনেকে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
তারা বলছে—দেখো! আগের লোকদের সিয়ামই আসল।
মরিয়মের সিয়াম, যাকারিয়ার সিয়াম, মুসার সিয়াম—
এইগুলোই অনুসরণ করতে হবে।
কিন্তু তারা ইচ্ছাকৃতভাবে আয়াতের পরের অংশটা চেপে যাচ্ছে।

বন্ধুগণ,
আয়াতের শেষ অংশটা হলো—
لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
“যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো”
এখানে কুরআন একটা মৌলিক নীতি স্থাপন করেছে।
আগের লোকদের সঙ্গে সাদৃশ্য উদ্দেশ্যে,
রীতিতে বা নিয়মে এক রকম নয়।
অর্থাৎ সব যুগেই সিয়ামের লক্ষ্য এক—তাকওয়া।
কিন্তু পদ্ধতি এক হবে—এমন কথা কুরআন বলেনি।
ঠিক যেমন—সব নবীর দ্বীন এক, কিন্তু শরিয়াহ এক নয়।

বন্ধুগণ,
এখন আসি সেই জায়গায়, যেটা অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যায়। আল্লাহ এরপর স্পষ্ট করে বলেন—
أَيَّامًا مَعْدُودَاتٍ
“নির্দিষ্ট কয়েকটি দিন”
(বাকারা ২:১৮৪)

এখানে অনেকে বলে—“দেখো! কয়েকটি দিন বলা হয়েছে। এক মাস তো বলা হয়নি।”
কিন্তু প্রশ্ন হলো—কুরআনের ভাষায় “কয়েকটি দিন”
মানে কত? তিন দিন? সাত দিন? দশ দিন? নাকি ত্রিশ দিন?
এই প্রশ্নের উত্তর কুরআন নিজেই দিয়েছে—একটু পরেই।

বন্ধুগণ,
আল্লাহ বলেন—
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ
“রমজান মাস—যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে”
(বাকারা ২:১৮৫)
এখানে “শাহর” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
আরবি ভাষায় “শাহর” মানেই পূর্ণ মাস।
তিন দিন, সাত দিন বা দশ দিনকে কখনোই “শাহর” বলা হয় না।
এটা ভাষাগতভাবে অসম্ভব।

বন্ধুগণ,
এরপর আল্লাহ সিদ্ধান্তমূলক ঘোষণা দেন—
فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ
“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এই মাস পাবে,
সে যেন এই মাসে সিয়াম পালন করে” (বাকারা ২:১৮৫)

এখানে আর কোনো ব্যাখ্যার সুযোগ নেই।
আল্লাহ নিজেই বলে দিলেন—মাস।
একদিন নয়, তিন দিন নয়, দশ দিন নয়—মাস।
যারা বলে “এক মাসের সিয়াম কুরআনে নেই”—
তারা হয় কুরআন পড়েনি, না হয় পড়েও অস্বীকার করছে।

বন্ধুগণ,
এখন আসি মরিয়মের সিয়াম প্রসঙ্গে।
কুরআনে বলা হয়েছে—
إِنِّي نَذَرْتُ لِلرَّحْمَٰنِ صَوْمًا فَلَنْ أُكَلِّمَ الْيَوْمَ إِنسِيًّا
“আমি দয়াময়ের জন্য সিয়ামের মানত করেছি,
আজ আমি কোনো মানুষের সাথে কথা বলব না”
(সূরা মারইয়াম ১৯:২৬)
এখানে “সাওম” শব্দ ব্যবহার হলেও এটি খাদ্য ত্যাগ নয়,
বরং কথা ত্যাগ।
তাহলে প্রশ্ন—এটা কি রমজানের সিয়ামের বিকল্প? না।
এটা ছিল এক বিশেষ পরিস্থিতিতে মরিয়মের ব্যক্তিগত মানত।

বন্ধুগণ,
যাকারিয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা। কুরআন বলে—
أَلَّا تُكَلِّمَ النَّاسَ ثَلَاثَ لَيَالٍ
“তোমার নিদর্শন হলো—
তুমি তিন রাত মানুষের সাথে কথা বলবে না”
(সূরা মারইয়াম ১৯:১০)
এটা কি খাদ্য-সিয়াম? না।
এটা কি ফরজ ইবাদত? না।
এটা ছিল এক অলৌকিক নিদর্শন।
তাহলে প্রশ্ন—এইগুলোকে টেনে এনে রমজানের সিয়াম বাতিল করা হয় কীভাবে?

বন্ধুগণ,
মুসার সিয়াম প্রসঙ্গে কুরআন বলে—
وَوَاعَدْنَا مُوسَىٰ ثَلَاثِينَ لَيْلَةً وَأَتْمَمْنَاهَا بِعَشْرٍ
“আমি মুসার সঙ্গে ত্রিশ রাতের ওয়াদা করেছিলাম,
পরে তা দশ দিয়ে পূর্ণ করেছিলাম”
(আ‘রাফ ৭:১৪২)
এখানে কোথাও বলা হয়নি—
এটা উম্মতের জন্য ফরজ সিয়াম।
এটা ছিল মুসার নবুয়তি প্রস্তুতির সময়।
অথচ কিছু মানুষ এই আয়াত টেনে এনে বলছে—
“এইটাই আসল সিয়াম।”

বন্ধুগণ,
এখানে একটা মারাত্মক ভুল হচ্ছে। নবীদের ব্যক্তিগত ইবাদত আর উম্মতের জন্য ফরজ বিধান এক জিনিস নয়। কুরআন নিজেই বলে—
لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا
“আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্য আলাদা শরিয়াহ ও পদ্ধতি নির্ধারণ করেছি”
(মায়েদা ৫:৪৮)
অতএব পূর্ববর্তী নবীদের বিশেষ ইবাদতকে এনে শেষ নবীর উম্মতের ফরজ বিধান বাতিল করা—এটা কুরআনের বিরুদ্ধে অবস্থান।

বন্ধুগণ,
এই পর্বের শেষ কথা একটাই—
সিয়াম আছে।
সিয়াম ফরজ।
সিয়াম নির্দিষ্ট মাসে।
সিয়াম রমজানে।
যারা তিন দিন, সাত দিন, দশ দিন, বা “সিয়ামই নাই”—
এই দাবিগুলো তুলছে, তারা কুরআনের আয়াতগুলো বিচ্ছিন্ন করে, প্রেক্ষাপট ছেঁটে, মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।

বন্ধুগণ, কেউ কেউ এখন সরাসরি বলছে—
“সিয়াম বলে কিছুই নাই।”
এটাকে ভুল বললে ভুল হবে — এটা কুরআনের স্পষ্ট অস্বীকার।
কুরআন বলছে—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে।” — (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৩)

বন্ধুগণ, এখানে প্রশ্নের কোনো জায়গা আছে?
“কুতিবা” মানে কী?
কুতিবা মানে হল-  বিধিবদ্ধ করা, লিখে দেওয়া, বাধ্যতামূলক করা।
যে ব্যক্তি বলে—“সিয়াম নাই”—সে আসলে বলছে,
“এই আয়াতটা আমি মানি না।”
এটা ব্যাখ্যার ইস্যু নয়, এটা ইমানের ইস্যু।

বন্ধুগণ, কেউ বলছে—সিয়াম মাত্র তিন দিনের।
তারা সাধারণত দুটো জায়গা ধরে—
১) হজের কাফফারার তিন দিন
২) পূর্ববর্তী উম্মতের কিছু নিদর্শন

কিন্তু কুরআন কী বলে?
فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ
“তোমাদের মধ্যে যে এই মাস পাবে, সে যেন এই মাসে সিয়াম করে।” — (২:১৮৫)

বন্ধুগণ, প্রশ্ন করি—
ভাই এই “মাস” শব্দটা কি তিন দিনের সমান?
আরও স্পষ্ট—
شَهْرُ رَمَضَانَ
“রমজান মাস…”
কুরআন নিজেই সিয়ামের সময়কাল নির্ধারণ করে দিয়েছে।
তিন দিন কোথা থেকে এলো?
👉 এটা খণ্ডিত আয়াত পাঠের ফল।

বন্ধুগণ, কেউ কেউ খুব চালাকির সাথে বলে—
“হজে তো দশ দিনের সিয়াম আছে,
সেখান থেকেই বোঝা যায় সিয়াম আসলে দশ দিনের।”

তারা যে আয়াত টানে—
فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ فِي الْحَجِّ وَسَبْعَةٍ إِذَا رَجَعْتُمْ
— (২:১৯৬)

বন্ধুগণ, এই আয়াতটা কীসের?
👉 হজের কাফফারা
👉 বিশেষ পরিস্থিতির বিকল্প বিধান

এটা রমজানের সিয়াম নয়।
যে ব্যক্তি কাফফারাকে মূল ইবাদতের জায়গায় বসায়,
সে কুরআনের বিধান কাঠামোই বোঝে না।

৪. “মরিয়মের সিয়ামই আসল”—এই বিভ্রান্তি কোথায়?
বন্ধুগণ, এখন আসি সবচেয়ে বেশি প্রচারিত দাবিতে—
মরিয়মের সিয়ামই আসল সিয়াম।
আয়াতটা কী বলে?
إِنِّي نَذَرْتُ لِلرَّحْمَٰنِ صَوْمًا فَلَنْ أُكَلِّمَ الْيَوْمَ إِنسِيًّا
— (সূরা মারইয়াম ১৯:২৬)

বন্ধুগণ, এখানে “সাওম” মানে কী?
👉 কথা না বলা
👉 নিরবতার মানত

কিন্তু প্রশ্ন হলো—
কুরআন কি এটাকে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য ফরজ করেছে
না। বরং একই কুরআন আবার বলে—
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ

বন্ধুগণ, মরিয়মের সিয়াম ছিল— 👉 নির্দিষ্ট ব্যক্তি
👉 নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট
👉 নির্দিষ্ট মানত

রমজানের সিয়াম হলো—
👉 পুরো উম্মত
👉 নির্দিষ্ট মাস
👉 নির্দিষ্ট বিধান

দুটোকে এক করে দেওয়া মানে কুরআনের শ্রেণিবিভাগ ধ্বংস করা।

বন্ধুগণ, হ্যাঁ—
জাকারিয়ার জন্য নিদর্শন ছিল তিন দিনের কথা না বলা।
মুসার ছিল চল্লিশ রাতের ইবাদত।
কিন্তু প্রশ্ন— কুরআন কি বলেছে,
“তোমরা এগুলোই অনুসরণ করো”?
না।
বরং কুরআন বলেছে—
لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا
“প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি আলাদা শরিয়ত ও পথ নির্ধারণ করেছি।” — (৫:৪৮)

বন্ধুগণ, পূর্ববর্তীদের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে,
কিন্তু বিধান কপি করতে হবে না।

বন্ধুগণ, কেউ কেউ বলে—
“এক মাস না খেয়ে থাকা অমানবিক।”
কুরআন কী বলে?
يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ
“আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান, কঠিন চান না।”
— (২:১৮৫)
তাই তো কুরআনই দিয়েছে—
👉 অসুস্থের ছাড়
👉 সফরকারীর ছাড়
👉 পরবর্তীতে পূরণের সুযোগ
আসলে, সমস্যা সিয়ামে নয়,
সমস্যা মানুষের কুরআনবিমুখ মনোভাবে।

বন্ধুগণ, বিভ্রান্তির মূল কারণ তিনটি—
১) কুরআনের আয়াত টুকরো করে পড়া
২) ইতিহাসকে বিধানের জায়গায় বসানো
৩) নিজের যুক্তিকে কুরআনের ওপরে তোলা
যখন কেউ বলে—
“আমার যুক্তিতে এটা ঠিক না”—
সে আসলে বলে— “আমি কুরআনের চেয়ে বড়।”

বন্ধুগণ, কুরআন অনুযায়ী—
✔ সিয়াম আছে
✔ সিয়াম ফরজ
✔ নির্দিষ্ট মাসে
✔ নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে—
لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
“যাতে তোমরা সচেতন হও”
এই স্পষ্ট কাঠামোর বাইরে যত কথাবার্তা—
👉 সবই বিভ্রান্তি
👉 সবই অতিরঞ্জন
👉 সবই কুরআনবিরোধী ব্যাখ্যা
সিয়াম নিয়ে বিতর্ক আসলে খাবার নিয়ে নয়।
এটা কর্তৃত্ব নিয়ে।
কে ঠিক করবে— আল্লাহ, না আমি?
যেদিন আমরা কুরআনের সামনে মাথা নত করবো,
সেদিন আর “তিন দিন, দশ দিন, নাই” —
এই শোরগোল থাকবে না।

Post a Comment

0 Comments