Subscribe Us

ভেজালের সভ্যতা, ভেজালের ধর্ম : কুরআনের আয়নায় আমাদের আত্মপ্রতারণা

 


ভেজালের সভ্যতা, ভেজালের ধর্ম : কুরআনের আয়নায় আমাদের আত্মপ্রতারণা


কেন এত ভেজাল পন্য? 
চারদিকে ভেজালের ছড়াছড়ি কেন?
যদি বাজারের ৯০ শতাংশ পণ্য ভেজাল হয়,
তাহলে সমস্যাটা কেবল বাজারের না।
সমস্যাটা মানুষের।
কারণ বাজার কোনো আলাদা সত্তা নয়—
বাজার পন্য তৈরীও করেনা ভোগও করেনা।
বাজার পরিচালিত হয় মানুষের দারা,
বাজার আমরা নিজেরাই।
আমাদের হাতেই পণ্য তৈরি হয়,
আমাদের হাতেই তা বিক্রি হয়,
আমরাই তা ভোগ করি।
ভেজাল কোনো ফেরেশতার কাজ না,
শয়তানও নিজ হাতে ভেজাল মেশায়না না।
ফরমালিন মেশায়না।
ভেজালের জন্মস্থান কোথায় জানেন?
ভেজাল জন্ম নেয় মানুষের লোভে,
মানুষের গোপন সিদ্ধান্তে,।
“একটু লাভ বেশি হলেই ক্ষতি কী” এই মানসিকতায়।

কুরআন এই বাস্তবতা বহু আগেই এক লাইনে বলে দিয়েছে—
﴿ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ﴾
“স্থলে ও জলে বিপর্যয় প্রকাশ পেয়েছে মানুষের হাতের কামাইয়ের কারণে।” (রূম ৩০:৪১)

এই আয়াত শুধু নদী-সমুদ্র দূষণের কথা বলে না।
এই আয়াত বলে মানুষের হাতের তৈরি নৈতিক বিপর্যয়ের কথা।
মানুষের হাতেই সম্পর্ক নষ্ট হয়,
মানুষের হাতেই বিশ্বাস ভাঙে,
মানুষের হাতেই ধর্মে ভেজাল ঢুকে।
আমরা আজ এমন এক সমাজে দাঁড়িয়ে আছি,
যেখানে খাবারে ভেজাল, ওষুধে ভেজাল, শিক্ষায় ভেজাল, রাজনীতিতে ভেজাল—
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হল,
মানুষগুলোই ভেজাল হয়ে গেছে।

আমরা একে অপরকে আর বিশ্বাস করতে পারি না। দোকানদার ক্রেতাকে ঠকায়,
ক্রেতা দোকানদারকে সন্দেহ করে।
অফিসে কর্মকর্তা দায়িত্ব এড়িয়ে চলে,
নাগরিক রাষ্ট্রকে গালি দেয়।
ছেলে মা–বাবার খবর নেয় না,
কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে আবেগ ঝরায়।
মুখে ন্যায়নীতি, আর হাতে প্রতারণা।
মুখে আল্লাহ আল্লাহ, আর কাজে অন্যায়, প্রতারণা।

কুরআন এই দ্বিমুখী আচরণকে ঘৃণার সাথে উল্লেখ্য করছেন।
﴿كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ﴾
“আল্লাহর কাছে এটি মারাত্মক ঘৃণার বিষয় যে,
তোমরা এমন কথা বলো যা নিজেরা করো না।” (সাফ ৬১:৩)

আমরা আজ ঘৃণার এই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছি।
কারণ আমরা যা বলি, তা করি না।
আমরা যা বিশ্বাস করি বলে দাবি করি,
তা জীবনে বাস্তবায়ন করিনা না।
ধর্ম আমাদের ছিল দায়িত্ব
কিন্তু ধর্ম শুধু এখন আমাদের, পরিচয়।
ধার্মিকতা আমাদের কাছে চরিত্র নয়, লেবেল।

আমরা ধর্মের কথা বলি সবচেয়ে বেশি,
কিন্তু ধর্মের নামে ক্ষতিও করি সবচেয়ে বেশি।
মুখে তাকওয়া, কাজে ঠকবাজি।
মসজিদে চোখে পানি, বাজারে ওজনে কম।
অথচ কুরআনের কাছে ধর্ম মানে কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। কুরআনের কাছে ধর্ম মানে দায়বদ্ধ জীবন,
ন্যায্য আচরণ, দুর্বলদের প্রতি দায়িত্ব।

এই কারণেই কুরআন যখন ধর্ম অস্বীকারকারীর পরিচয় দেয়,
তখন বলে না— সে নামাজ পড়ে না। বরং বলে—
﴿فَذَٰلِكَ الَّذِي يَدُعُّ الْيَتِيمَ ۝ وَلَا يَحُضُّ عَلَىٰ طَعَامِ الْمِسْكِينِ﴾
“সে সেই ব্যক্তি, যে এতিমকে ধাক্কা দেয় এবং অভাবীকে খাবার দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করে না।” (মাউন ১০৭:২–৩)

অর্থাৎ, কুরআনের দৃষ্টিতে ধর্ম অস্বীকার মানে শুধু মুখে অস্বীকার নয়;
দায়িত্ব অস্বীকারই আসল অস্বীকার।
সমাজের দুর্বল মানুষের প্রতি দায় না থাকাই প্রকৃত ধর্ম অস্বীকার।

আজ আমরা সমাজের সব দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপাতে পারদর্শী।
সরকার খারাপ, প্রশাসন খারাপ, সমাজ খারাপ, তরুণরা খারাপ।
কিন্তু কুরআন আঙুল ঘুরিয়ে দেয় আমাদের নিজেদের দিকেই।
কুরআন বলে—
﴿بَلِ الْإِنسَانُ عَلَىٰ نَفْسِهِ بَصِيرَةٌ﴾
“বরং মানুষ নিজেই নিজের ব্যাপারে সচেতন সাক্ষী।” (কিয়ামা ৭৫:১৪)

এই আয়াতের অর্থ খুব সাধারণ।
মানুষ জানে সে কোথায় মিথ্যা বলছে,
কোথায় ঠকাচ্ছে, কোথায় ধর্মকে ঢাল বানাচ্ছে।
কিন্তু সে চুপ থাকে। এই চুপ থাকাই ভেজালের শুরু।
আমরা ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, হালাল-হারাম সব একসাথে মিশিয়ে ফেলেছি।
একটু নামাজ, একটু অন্যায়। একটু দান, একটু ঠকানো।
একটু ধর্ম, একটু স্বার্থ। কুরআন এই অবস্থাকে বলে—
﴿خَلَطُوا عَمَلًا صَالِحًا وَآخَرَ سَيِّئًا﴾
“তারা ভালো কাজের সাথে মন্দ কাজ মিশিয়ে ফেলেছে।” (তাওবা ৯:১০২)

এই মিশ্রণই আমাদের সমাজকে অসুস্থ করে তুলেছে।
কারণ মানুষ ভাবছে—
কিছু ভালো কাজ করলেই সব অন্যায় ঢেকে যাবে।
কিন্তু কুরআন এমন কোনো ছাড়পত্র দেয়নি।

এর চেয়েও ভয়ংকর জায়গায় আমরা পৌঁছেছি ধর্মের ক্ষেত্রে। আজ সমাজে যে ধর্ম চর্চা হচ্ছে,
তার বড় অংশই নির্ভেজা বা পরিশুদ্ধ মানুষ তৈরি করছে না।
বরং দলের প্রতি অন্ধমানুষ, মতান্ধ মানুষ, মুনাফেক মানুষ তৈরি করছে।
কুরআনের সহজ দায়িত্বভিত্তিক ধর্ম,
চাপা পড়ে যাচ্ছে ব্যাখ্যা, বর্ণনা আর মানুষের বানানো কাঠামোর নিচে।

কুরআন যেখানে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেয়—
﴿تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ﴾
“সব কিছুর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা।” (নাহল ১৬:৮৯)

সেখানে আমরা বলি— কুরআন একা যথেষ্ট নয়।
তাকে বুঝতে আরও অনেক কিছু দরকার।
অথচ আল্লাহ স্পষ্ট করে বলেছেন—
﴿مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ﴾
“এই কিতাবে আমি কোনো কিছুই বাদ দেইনি।”
(আন‘আম ৬:৩৮)

এই বিশ্বাস হারিয়ে যাওয়াই ভেজাল ধর্মের শুরু।
যখন মানুষ কুরআনের উপর থেকে মুখ ঘুড়িয়ে নেয়,
তখন সে মানুষের কথাকে আল্লাহর কথার উপর বসায়।
এখান থেকেই ধর্ম ক্ষমতার হাতিয়ার হয়,
নৈতিকতার শিক্ষক নয়।

ফলে কী হয়? মানুষ ধর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকে,
কিন্তু নিজেকে শুদ্ধ করার কথা ভুলে যায়।
ধর্ম অন্যকে বিচার করার যন্ত্র হয়,
নিজেকে পরিশুদ্ধ করার পথ হারিয়ে ফেলে।

কুরআন বলছে,
﴿فَلَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ ۚ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَىٰ﴾
“তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি করো না;
কে সত্যিকারের পরিশুদ্ধ, আল্লাহই ভালো জানেন।”
(নাজম ৫৩:৩২)

কিন্তু আমরা ঠিক উল্টোটা করছি।
আমরা নিজেকে পবিত্র ভাবছি,
আর অন্যকে মনে করছি অপবিত্র।
আমার দল ঠিক, অন্য দল ভুল।
আমার বুঝ ঠিক, অন্যের বুঝ ভ্রান্ত।
এই মানসিকতা থেকেই ধর্ম বিভক্ত হয়,
সমাজ ভাঙে, মানুষ মানুষকে ঘৃণা করতে শেখে।

১টা প্রশ্নের উত্তর খোজাটা খুব জরুরী —
আমরা এত ইবাদত করছি, এত কথা বলছি,
এত ধর্মচর্চা করছি—তবুও কেন আমরা শুদ্ধ হচ্ছি না?

এর উত্তর কুরআন নিজেই দেয়।
কারণ আমরা পরিশুদ্ধতাকে গুরুত্ব দিইনি।
আমরা সালাত করেছি, কিন্তু আতুয্‌যাকাত করিনি।
আমরা আচার নিয়েছি, কিন্তু আত্মশুদ্ধির পথ নিইনি।

আল্লাহ বারবার বলেছেন—
﴿قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى﴾
“নিশ্চয়ই সফল সে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে।”
(আ‘লা ৮৭:১৪)

সাফল্যের শর্ত এখানে নামাজ না,
রোজা না, বাহ্যিক ধর্ম না—বরং পরিশুদ্ধতা।
এই পরিশুদ্ধতা কী, কীভাবে, কেন—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আমরা এখন দেখবো।

এই সমাজে আমরা শুদ্ধতার কথা বলি সবচেয়ে বেশি,
কিন্তু পরিশুদ্ধ হওয়ার পথে হাঁটি সবচেয়ে কম।
কারণ আমরা পরিশুদ্ধতাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি কিছু আনুষ্ঠানিক আচারে—
কিছু টাকা দেওয়া, কিছু দোয়া পড়া,
কিছু রীতি পালন করা।
অথচ কুরআন যখন “আতুযযাকাত” শব্দটি ব্যবহার করে, তখন সেটাকে কেবল অর্থনৈতিক দান হিসেবে হাজির করে না;
হাজির করে এক গভীর নৈতিক ও আত্মিক বিপ্লব হিসেবে। কুরআনের ভাষায় যাকাত মানে শুধু “দেওয়া” নয়—যাকাত মানে পরিশুদ্ধ হওয়া,
ভেতরের ময়লা ঝরিয়ে ফেলা, চরিত্রকে ধুয়ে ফেলা।

আল্লাহ বলেন—
﴿قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى﴾
“নিশ্চয়ই সফল সেই ব্যক্তি, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে।” (আ‘লা ৮৭:১৪)

খেয়াল করুন—এখানে সফলতার শর্ত হিসেবে সালাতের কথা আগে আসেনি,
রোজার কথা আগে আসেনি;
আগে এসেছে তাযকিয়া—আত্মশুদ্ধি।
কারণ ভেতর যদি নোংরা থাকে,
বাইরে যত ইবাদতই করা হোক,
তা সমাজে ন্যায়ের ফল দেবে না।
ভেতর যদি ভেজাল থাকে, বাইরে যত ধর্মই দেখানো হোক,
তা মানুষকে রক্ষা করবে না।

আতুযযাকাত : শুধু অর্থ নয়, চরিত্রের হিসাব
আমরা যাকাতকে শুধু টাকার অংকে নামিয়ে এনেছি।
হিসাব করি—২.৫% কত হলো, কাকে দিলে দায় শেষ।
কিন্তু কুরআন যাকাতকে এই সীমায় আটকে রাখেনি। কুরআন যাকাতকে মানুষের লোভ, স্বার্থপরতা, প্রতারণা, অহংকার, নির্দয়তা—
এই সব ভেজাল থেকে মুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরেছে।

আল্লাহ রাসূলকে উদ্দেশ করে বলেন—
﴿خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا﴾
“তাদের সম্পদ থেকে দান গ্রহণ করো—
যার মাধ্যমে তুমি তাদের পরিশুদ্ধ করবে এবং পরিমার্জিত করবে।” (তাওবা ৯:১০৩)

এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয়—
দান বা যাকাতের মূল উদ্দেশ্য গরিবকে দেওয়া নয়;
দানকারীকেই শুদ্ধ করা। গরিব উপকার পায়, এটা সত্য। কিন্তু আল্লাহর মূল লক্ষ্য হলো—
যে দিচ্ছে, সে যেন ভেতর থেকে বদলায়।
কারণ যে মানুষ দান করে কিন্তু প্রতারণা ছাড়ে না,
সে এখনো অপবিত্র।
যে মানুষ যাকাত দেয় কিন্তু ওজনে কম দেয়,
সে এখনো ভেজাল।
যে মানুষ দান করে কিন্তু এতিমকে ধাক্কা দেয়, সে এখনো সূরা মাউনের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে।

পরিশুদ্ধতা ছাড়া সালাত :
কুরআনের চোখে মূল্যহীন আচার।
সূরা আল-মাউন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়-
সালাত কায়েম করলেই কেউ দ্বীনদার হয়ে যায় না।
বরং এমন সালাতও আছে, যার জন্য ধ্বংস ঘোষণা করা হয়েছে।

আল্লাহ বলেন—
﴿فَوَيْلٌ لِلْمُصَلِّينَ ۝ الَّذِينَ هُمْ عَنْ صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ﴾
“ধ্বংস সেই সালাতকারীদের জন্য—যারা তাদের সালাত সম্পর্কে উদাসীন।” (মাউন ১০৭:৪–৫)

এই উদাসীনতা মানে নামাজ না পড়া নয়;
বরং সালাতের উদ্দেশ্য  থেকে উদাসীন থাকা।
সালাত যদি মানুষকে লোভ থেকে, ভেজাল থেকে, নিষ্ঠুরতা থেকে না ফেরায়—
তাহলে সেই সালাত কেবল শরীরের ব্যায়াম, আত্মার নয়।
এই কারণেই সূরা মাউন আগে এতিম ও মিসকিনের কথা বলেছে, তারপর সালাতের কথা বলেছে।
অর্থাৎ—সামাজিক দায়িত্ব ছাড়া ইবাদত কুরআনের দৃষ্টিতে ভণ্ডামি।

এই সমাজ আতুযযাকাত শব্দটাকে ভয় পায়।
কারণ আতুযযাকাত মানে শুধু টাকা ছাড় নয়;
আতুযযাকাত মানে—
ভেজাল পণ্য ছাড়তে হবে
লেনদেনে ধোঁকা ছাড়তে হবে
সম্পর্কের ভণ্ডামি ছাড়তে হবে
ধর্মের নামে ব্যবসা ছাড়তে হবে
কুরআনের বাইরে বানানো কর্তৃত্ব ছাড়তে হবে

এই কারণেই আতুযযাকাতকে আমরা ছোট করে ফেলেছি—শুধু ফকিরকে টাকায় দেয়ায় সীমাবদ্ধ করে দিয়েছি।
কারণ যদি যাকাত মানে হয় আত্মশুদ্ধি,
তাহলে আমাদের ধর্মীয় মুখোশ খুলে পড়ে যাবে।
তখন দেখা যাবে—
আমরা নামাজি ঠিকই, কিন্তু আমানতদার নই।
আমরা রোজাদার ঠিকই, কিন্তু ন্যায়পরায়ণ নই।
আমরা হজ করে হাজী হয়েছি ঠিকই-
কিন্তু মানুষ ঠকানো ছাড়িনি।

কুরআন এই দ্বিচারিতাকে এক কথায় বাতিল করে দেয়—
﴿لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنْكُمْ﴾
“আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না পশুর গোশত বা রক্ত;
তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” (হজ ২২:৩৭)

পরিশুদ্ধ হওয়া মানে ফেরেশতা হয়ে যাওয়া নয়।
পরিশুদ্ধ হওয়া মানে ভুল না করা নয়।
পরিশুদ্ধ হওয়া মানে—
ভুল করলে অজুহাত না দাঁড় করানো
অন্যায় করলে ধর্ম দিয়ে ঢেকে না ফেলা
নিজের দোষ আগে দেখা
আয়াতকে নিজের বিরুদ্ধে পড়া

আল্লাহ বলেন—
﴿بَلِ الْإِنسَانُ عَلَىٰ نَفْسِهِ بَصِيرَةٌ﴾
“মানুষ নিজেই নিজের ব্যাপারে সচেতন সাক্ষী।”
(কিয়ামা ৭৫:১৪)

এই আয়াত আমাদের আয়নার সামনে দাঁড় করায়।
বলে—তুমি জানো, তুমি কতটা ভেজাল।
তুমি জানো, কোথায় তুমি ঠকাচ্ছ।
তুমি জানো, কোন আয়াতটা তুমি এড়িয়ে যাচ্ছ।

বন্ধুগণ!
তুমি কি রাষ্ট্র বদলাতে চাও?
বাজার ঠিক করতে চাও?
ধর্মকে জীবিত করতে চাও?
কুরআন বলে—শুরু করো আতুযযাকাত দিয়ে।
কারণ আইন দিয়ে মানুষকে কিছুটা ঠেকানো যায়,
কিন্তু চরিত্র ছাড়া সমাজ শুদ্ধ হয় না।

এই কারণেই আল্লাহ বলেন—
﴿قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا ۝ وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا﴾
“নিশ্চয়ই সফল সে, যে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে;
আর ব্যর্থ সে, যে তাকে মাটিচাপা দিয়েছে।” (শামস ৯১:৯–১০)

এই আয়াত আমাদের শেষ সতর্কবার্তা।
ভেজাল চাপা দিয়ে ধর্ম টিকবে না।
ভেজাল লুকিয়ে ইমান বাঁচবে না।
একদিন সব মুখোশ খুলে পড়বেই।

বন্ধুগণ!
আল্লাহ আমাদের কাছে নিখুঁত মানুষ চান না।
আল্লাহ চান সৎ মানুষ। আল্লাহ চান এমন মানুষ,
যে ভেজালকে স্বীকার করে এবং শুদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করে।
আতুযযাকাত সেই পথ—
যে পথ মানুষকে বাজার থেকে মসজিদে নয়,
মসজিদ থেকে জীবনে ফিরিয়ে আনে।

ভেজালমুক্ত সমাজ কোনো স্লোগান দিয়ে আসে না।
ভেজালমুক্ত সমাজ আসে—ভেজালমুক্ত মানুষ দিয়ে।
আর ভেজালমুক্ত মানুষ তৈরি হয়—
কুরআনের আতুযযাকাত বুঝে, মেনে, বাঁচিয়ে।

এখানেই কুরআনের বিপ্লব।

Post a Comment

0 Comments