Subscribe Us

অন্ধকার থেকে আলোর পথে

 অন্ধকার থেকে আলোর পথে

লিখকঃ- মাহাতাব আকন্দ 

ন্ধুরা, ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমরা দেখি এক ভয়ঙ্কর অন্ধকার যুগ। সেই যুগে পৃথিবী যেন ডুবে ছিল অন্যায় অপকর্মের গভীর খাদে। 

মানুষ তখন দাসত্বের শিকলে বন্দী। 

শক্তিশালী দুর্বলকে পদদলিত করত।

 নারী ছিল অবমাননার প্রতীক। 

জ্ঞান ছিল অজ্ঞতার মরুভূমিতে চাপা। 

সমাজে ন্যায় ছিল না, সত্য ছিল না, মানবতা ছিল না।  


কল্পনা করো—একটি পৃথিবী যেখানে মানুষের কোনো মর্যাদা নেই। যেখানে দাসকে পশুর মতো কেনা-বেচা করা হয়। যেখানে নারীর জন্মকে অভিশাপ মনে করা হয়। 

যেখানে শিশুদের হত্যা করা হয় কুসংস্কারের নামে।

যেখানে শক্তিশালী দুর্বলকে শোষণ করে, 

আর দুর্বলরা নীরবে সহ্য করে।  


মানুষ তখন পূজা করত আগুনকে, পূজা করত পাথরের মূর্তিকে, পূজা করত রাজাকে। 

কেউ সূর্যকে দেবতা বানাতো, কেউ চাঁদকে পূজা করত। 

কেউ আবার নদী, গাছ, পশু—সবকিছুকেই দেবতা বানিয়ে ফেলত। 

তারা ডুবে ছিল মিথ্যার কাদায়, অজ্ঞতার অন্ধকারে।  


জ্ঞান তখন ছিল বিরল। 

মানুষ জানত না সত্য কী, জানত না ন্যায় কী। 

তারা অজ্ঞতার মরুভূমিতে ঘুরে বেড়াত। 

কুসংস্কার, মিথ্যা, শিরক—এসবই ছিল তাদের জীবনের অংশ।

 সভ্যতা ছিল ভেঙে পড়া, সমাজ ছিল অমানবিক।  


ঠিক তখনই আসমান থেকে নেমে এলো আলোর বান—কুরআন। 

আল্লাহর কালাম মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালালো। 

কুরআন বলল:   - মানুষ স্বাধীন।  - নারী সম্মানিত।

- জ্ঞানই শক্তি। আর- সত্যই মুক্তি।  

এই কালাম ভেঙে দিলো অন্ধকারের দেয়াল। 

দাসপ্রথার শিকল ছিঁড়ে গেল। নারী পেল মর্যাদা। 

অজ্ঞতার মরুভূমি হয়ে উঠল জ্ঞানের ভান্ডার।  


কুরআন শুধু ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, এটি হলো বিপ্লবের ম্যানিফেস্টো। 

এটি হলো বিদ্রোহের ডাক। এটি হলো মুক্তির সোপান।  

কুরআন বলল—“তোমরা চিন্তা করো, তোমরা গবেষণা করো, তোমরা সৃষ্টি করো।”  

কুরআন বলল—“ন্যায় প্রতিষ্ঠা করো, সত্য আঁকড়ে ধরো, শিরক ভেঙে ফেলো।”  

এই ডাক ছিল বিপ্লবী ডাক। 

এই ডাক ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক।  


কুরআনের আলোয় মানুষ আবার মানুষ হলো। 

দাস হলো মুক্ত। নারী পেল সম্মান। শিশু পেল নিরাপত্তা।

সমাজ পেল ন্যায়। সভ্যতা পেল নতুন জীবন।  

কুরআন বলল—“আল্লাহর কাছে সবাই সমান।”  

কুরআন বলল—“তোমরা একে অপরের ভাই।”  

কুরআন বলল—“অন্যায় করো না, শোষণ করো না।”  


এই কালাম বানালো বেদুইন জাতিকে সভ্যতার নেতা। এই কালাম বানালো উম্মাহকে দুনিয়ার পথপ্রদর্শক।  


বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর

আমি আজ বিদ্রোহী হয়ে বলছি—  

যে যুগে মানুষ অমানবিকতায় ডুবে ছিল, সেই যুগে কুরআন এলো আলো হয়ে।  

যে যুগে নারীকে অবমাননা করা হতো, সেই যুগে কুরআন দিলো মর্যাদা।  

যে যুগে দাসকে পশুর মতো ব্যবহার করা হতো, সেই যুগে কুরআন দিলো স্বাধীনতা।  

যে যুগে অজ্ঞতা ছিল সর্বত্র, সেই যুগে কুরআন দিলো জ্ঞানের আলো।  


অন্ধকার ভাঙার গল্প

কুরআন এলো বিপ্লবের গল্প নিয়ে। 

কুরআন এলো মুক্তির গল্প নিয়ে।  

কুরআন এলো মানবতার গল্প নিয়ে।  

এই গল্প হলো অন্ধকার ভাঙার গল্প।  

এই গল্প হলো আলো জ্বালানোর গল্প।  

এই গল্প হলো সভ্যতার পুনর্জন্মের গল্প।  


বন্ধুরা, কুরআনের আলো শুধু মানুষের হৃদয়কে জাগায়নি,

এটি জাগিয়েছে মানুষের মস্তিষ্ককে।  

এটি শুধু দাসপ্রথার শিকল ভেঙে দেয়নি, 

এটি ভেঙে দিয়েছে অজ্ঞতাও ভন্ডামির শিকলকেও।  

কুরআন মানুষকে শিখিয়েছে চিন্তা করতে, 

গবেষণা করতে, সৃষ্টি করতে।  

এভাবেই শুরু হলো জ্ঞানের বিপ্লব।  


কুরআন বলেছে: “তারা কি চিন্তা করে না আসমান ও জমিনের সৃষ্টি নিয়ে?”  

কুরআন বলেছে: “তোমরা জ্ঞান অর্জন করো, 

কারণ জ্ঞানই আলো, জ্ঞানই সব।”  

এই আহ্বান ছিল বিদ্রোহের আহ্বান।  

অজ্ঞতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।  

কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।  

ভন্ডামির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।  


মানুষ বুঝতে পারল—জ্ঞান ছাড়া মুক্তি নেই।  

মানুষ বুঝতে পারল—চিন্তা ছাড়া উন্নতি নেই।  

মানুষ বুঝতে পারল—গবেষণা ছাড়া সভ্যতা নেই।  

কুরআনের আলোয় জন্ম নিলো জ্ঞানের রাজধানী।  

বাগদাদ হলো জ্ঞানের কেন্দ্র।  

কায়রো হলো গবেষণার শহর।  

কর্ডোভা হলো শিক্ষার নগরী।  

সেখানে গড়ে উঠল বিশ্ববিদ্যালয়।  

সেখানে গড়ে উঠল গ্রন্থাগার।  

সেখানে গড়ে উঠল গবেষণাগার।  

মানুষ দিনরাত পড়াশোনা করত।  

মানুষ দিনরাত গবেষণা করত।  

মানুষ দিনরাত আবিস্কার করত।  


বন্ধুগণ!

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, 

যখন একটি গ্রন্থ, একটি বক্তব্য, একটি চিন্তা বিশ্বের গতিপথ বদলে দেয়। 

কুরআন সেই বিপ্লবী গ্রন্থ। 

কুরআন যখন ঘোষণা করল — "اقرأ" — পড়ো! — 

তখন এটি শুধু ধর্মের নির্দেশ ছিল না, 

এটি ছিল মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির প্রতি আহ্বান। 

এটি ছিল মহাবিশ্বকে বোঝার আমন্ত্রণ। 

কুরআন বলল, দেখো, চিন্তা করো, অনুসন্ধান করো, খোঁজ করো।

এ ছিল মানবীয় বিবেকের শৃঙ্খলমুক্তির ডাক।


বন্ধুগণ!

এই ডাক শুধু মসজিদের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

এটি জ্ঞানের শহর, গ্রন্থাগার, পর্যবেক্ষণকেন্দ্র, গণিত শালা, হাসপাতাল ও গবেষণাগারে পরিণত হলো। 

কুরআন কখনো মানুষকে অন্ধ অনুসরণে ডাকে না — কুরআন ডাকে চিন্তা, পর্যবেক্ষণ, যুক্তি ও প্রমাণে। 

তাই মুসলিম জাতির প্রথম প্রজন্ম বিশ্বকে বলেছিল:

ধর্ম মানে শুধু ইবাদত নয়; ধর্ম মানে জ্ঞান।


বন্ধুগণ!

এই আন্দোলনকে বলা হয় — ইলমের বিপ্লব। 

এবং এই বিপ্লবই জন্ম দিয়েছিল সেই বিজ্ঞানীদের, 

যাদের আলোয় ইউরোপের অন্ধকার ভেঙে রেনেসাঁ জন্ম নিলো। 

মুসলিমরা আবিষ্কার করেছিল হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, ফার্মেসি, মানচিত্রনির্মাণ, পর্যবেক্ষণাগার এবং গবেষণাগার — শত শত বছর আগে।

এই বিপ্লব থেকে জন্ম নিল সেই মানুষগুলো, 

যারা বিশ্বকে দিল ওষুধ, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রাসায়ন, দর্শন, মানববিদ্যা, অর্থনীতি, এমনকি রোবোটিক্সও।


বন্ধুগণ!

গণিতের অগ্রদূত আল-খাওয়ারিজমি হিসাবের কাঠামো তৈরি করলেন। 

তিনি উদ্ভাবন করলেন Al-Jabr — অ্যালজেব্রা, 

এবং তাঁর নাম থেকেই জন্ম নিলো Algorithm শব্দটি।

আধুনিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের ভিত্তি তার ঘরে লেখা।


চিকিৎসা জগতে ইবনে সিনা এমন এক কিতাব লেখেন — যার নাম “আল-কানুন ফি-তিব্ব”, 

যা ৭০০ বছর ইউরোপের মেডিকেল পাঠ্যবই ছিল। 

তাঁর আরেক গ্রন্থ আল-শিফা 

দর্শন, মনস্তত্ত্ব ও মেডিসিনের অদ্ভুত সেতুবন্ধন।


বন্ধুগণ!

আল-বিরুনি পৃথিবীর ব্যাসার্ধ এমন নির্ভুলভাবে হিসাব করেছিলেন যে,

১০০০ বছর পরে আধুনিক পরিমাপ তার কাছাকাছিই দাঁড়িয়েছে। 

তিনি সময়, পৃথিবীর গতি, দ্রাঘিমা ও অক্ষাংশ নির্ণয় করলেন,

— শুধু পর্যবেক্ষণ, গণনা ও যুক্তির মাধ্যমে।


বন্ধুগণ!

ইবনে হাইথাম প্রমাণ করলেন আলো সরলরেখায় চলে। 

তিনি লেন্স, প্রতিফলন, প্রতিসরণ, 

অপটিক্স ও দৃষ্টিবিজ্ঞানের পথে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জন্ম দিলেন। 


বন্ধুগণ!

জাবির ইবন হাইয়ান রসায়নকে সরাসরি পরীক্ষাগারে নিয়ে গেলেন। 

তাঁর হাতে জন্ম নিল ডিস্টিলেশন, ফিল্টারেশন, ক্রিস্টালাইজেশন, অ্যাসিড, এলকোহল, ফার্মাকোলজি। 

তাই তাকে বলা হয় — Chemistry’র জনক।


বন্ধুগণ!

যান্ত্রিক বিজ্ঞানে আল-জাযারি এমন যন্ত্র বানালেন, 

যেগুলো আধুনিক রোবোটিক্সের পূর্বরূপ। 

তিনি স্বয়ংক্রিয় পানি উত্তোলন যন্ত্র, যান্ত্রিক ঘড়ি, অটোমেটেড সার্ভিং মেশিন তৈরি করেন। 

ইতিহাস বলছে — লিওনার্দো দা ভিঞ্চিও তার নকশা অনুসরণ করেছিলেন।


বন্ধুগণ!

আর সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসবিজ্ঞানের অগ্রদূত ছিলেন ইবনে খালদুন। 

তাঁর Muqaddimah আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাষ্ট্রতত্ত্ব ও ইতিহাস-লিখনের ভিত্তি স্থাপন করেছে। 

পশ্চিম আজ তাকে বলে —

“The father of Sociology.”


বন্ধুগণ!

এই বিজ্ঞানীরা কুরআনকে ধর্মীয় ভাষায় নয়, 

বরং কুরআনের বুদ্ধিদীপ্ত ভাষায় সাড়া দিয়েছিলেন। 

তারা শুনেছিলেন কুরআনের আহ্বান:

"أفلا ينظرون" — তারা কি দেখবে না?

"أفلا يعقلون" — তারা কি বুদ্ধি ব্যবহার করবে না?

"أفلا يتفكرون" — তারা কি চিন্তা করবে না?

"قل سيروا في الأرض" — পৃথিবীতে চলাফেরা করো, অনুসন্ধান করো


বন্ধুগণ!

তাই তারা মসজিদের মিনারে উঠেননি — উঠেছিলেন গবেষণাগারের মিনারে।

তারা শুধু প্রার্থনা করেননি — প্রমাণ করেছেন, পরীক্ষা করেছেন, মাপ নিয়েছেন, হিসাব করেছেন, সংশোধন করেছেন।


বন্ধুগণ!

এইসব বিজ্ঞানীরা কুরআনের আহ্বান শুনে জ্ঞান সৃষ্টি করলেন। 

তারা বুঝলেন — কুরআন শুধু প্রার্থনার বই নয়; 

এটি চিন্তার বই, গবেষণার বই, মহাবিশ্ব পাঠের বই।

এ কারণেই বলা হয়:

“যেখানে কুরআন নেমেছিল — সেখানে জ্ঞানের বিপ্লব জন্ম নিয়েছিল।”


এই জ্ঞান ছিল বিপ্লবী জ্ঞান।  

এটি ভেঙে দিলো অজ্ঞতার দেয়াল।  

এটি ভেঙে দিলো কুসংস্কারের শিকল।  

এটি ভেঙে দিলো পরধীনতার বাঁধন।  

মানুষ বুঝল—জ্ঞানই শক্তি।  

মানুষ বুঝল—জ্ঞানই মুক্তি।  

মানুষ বুঝল—জ্ঞানই সভ্যতা।  

এই জ্ঞানের বিপ্লব বানালো সভ্যতার পুনর্জন্ম।  

যে জাতি ছিল বেদুইন, তারা হলো দুনিয়ার নেতা।  

যে জাতি ছিল পেছনে পড়া, তারা হলো অগ্রগামী।  

যে জাতি ছিল অজ্ঞ, তারা হলো জ্ঞানী।  

তারা বানালো সভ্যতা।  

তারা বানালো ইতিহাস।  

তারা বানালো সংস্কৃতি।  

যে জাতি কুরআনকে আঁকড়ে ধরেছিল, তারা হলো অগ্রণী।  

যে জাতি কুরআনকে আঁকড়ে ধরেছিল, তারা হলো নেতা।  

যে জাতি কুরআনকে আঁকড়ে ধরেছিল, তারা হলো মুক্ত।  


বন্ধুরা, ইতিহাসের প্রতিটি উত্থানের পেছনে থাকে একটি শক্তিশালী ভিত্তি। 

আর প্রতিটি পতনের পেছনে থাকে সেই ভিত্তি থেকে বিচ্যুতি।

অর্থাৎ যা আকড়ে ধরলে উথ্বান হয়, তা ছেড়ে দিলেই পতন শুরু হয়। 

মুসলিম জাতির উত্থান হয়েছিল কুরআনকে আকড়ে ধড়ে, 

আর তাদের পতন হয়েছিল কুরআন থেকে বিমুখ হওয়ার কারণে।  


যে জাতি একদিন কুরআনকে আঁকড়ে ধরেছিল, 

তারা ধীরে ধীরে কুরআন থেকে দূরে সরে গেল।  

তারা কুরআনের বদলে তুলে নিলো কাহিনী।  

তারা আল্লাহর বিধানকে ভুলে গেল।  

তারা মানুষের মতকে আল্লাহর কালামের ওপরে স্থান দিল।

তারা মানব রচিত কিতাবকে আল্লাহর কিতাবের উপর প্রাধান্য দিল।  


কুরআন বলেছিল—“তোমরা বিভক্ত হয়ো না।”  

কুরআন বলেছিল—“তোমরা সত্য আঁকড়ে ধরো।”  

কুরআন বলেছিল—“তোমরা শিরক থেকে দূরে থাকো।”  

কিন্তু তারা বিভক্ত হলো।  

তারা সত্য ছেড়ে দিল।  

আল্লাহর বিধানের সাথে অন্য বিধান জুড়ে দিল।

শয়তান তাদের মনে ঢুকিয়ে দিল নতুন নতুন কাহিনী।  

তারা বানালো নতুন কিতাব।  

তারা বানালো নতুন নিয়ম।  

তারা বানালো নতুন পথ।  

কুরআনের বদলে তারা মানলো মানুষের মত।  

কুরআনের বদলে তারা মানলো লোককথা।  

ফলাফল?  

তাদের হৃদয় হলো দুর্বল।  

তাদের সমাজ হলো বিভক্ত।  

তাদের সভ্যতা হলো ভেঙে পড়া।  


উম্মাহ একসময় ছিল ঐক্যবদ্ধ।  

তারা ছিল এক দেহ, এক প্রাণ, এক শক্তি।  

কিন্তু ধীরে ধীরে তারা হলো বিভক্ত।  

তারা হলো দলে দলে।  

তারা হলো গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে।  

তারা হল মাজহাবে মাজহাবে

কুরআন বলেছিল—“তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জু আঁকড়ে ধরো।”  

কিন্তু তারা সেই রজ্জু ছেড়ে দিল।  

তারা আঁকড়ে ধরলো নিজেদের মত।  

তারা আঁকড়ে ধরলো নিজেদের দল।  

তারা আঁকড়ে ধরলো নিজেদের স্বার্থ।  

ফলাফল?  

উম্মাহ হলো দুর্বল।  

উম্মাহ হলো বিভক্ত।  

উম্মাহ হলো পরাজিত।  


যে জাতি একসময় ছিল দুনিয়ার নেতা, 

তারা হয়ে পেছনে পড়া।  

যে জাতি একসময় ছিল অগ্রণী, তারা হলো দুর্বল।  

যে জাতি একসময় ছিল মুক্ত, তারা হলো বন্দী।  

তাদের পতন শুরু হলো ধীরে ধীরে।  

তাদের শক্তি কমতে লাগলো।  

তাদের মর্যাদা হারাতে লাগলো।  

তাদের সভ্যতা ভেঙে পড়তে লাগলো।  

জাতির পতনের সূচনা হয়েছিল কুরআন থেকে বিমুখ হওয়ার কারণে।  

পতনের সূচনা হয়েছিল শিরককে আঁকড়ে ধরার কারণে।  

পতনের সূচনা হয়েছিল বিদআতে ডুবে যাওয়ার কারণে।  

পতনের সূচনা হয়েছিল বিভক্ত হওয়ার কারণে।  


বন্ধুগণ! ইতিহাস কখনো হঠাৎ করে রক্ত ঝরায় না—সুযোগ পেলেই ঝরায়।

মুসলিম উম্মাহ যখন ছিল কুরআনের আলোয় উজ্জ্বল, 

তখন পৃথিবীর কোনো শক্তির সাহস ছিল না তাদের সামনে দাঁড়ানোর।

কিন্তু যখন সেই আলো ম্লান হয়ে গেলো, 

যখন বই বন্ধ হয়ে গেল, 

যখন জ্ঞানের পথ থেমে গেল—তখন শত্রুরা বুঝল, 

সময় এসে গেছে।


বন্ধুগণ! প্রথমেই সুযোগ নিলো ক্রুসেডাররা।

তারা এলো ক্রুশের পতাকা হাতে, ঘৃণার আগুন বুকে, 

যুদ্ধের উন্মত্ততা নিয়ে। তারা আক্রমণ করলো—

হত্যা করলো— লুট করলো— ধ্বংস করলো—

এবং নির্বিচারে রক্ত ঝরালো।


বন্ধুগণ! যে জাতি একদিন জ্ঞান দিতো, 

আজ সে জাতি রক্ত দিচ্ছে।

যে জাতি একদিন শাসন করতো, 

আজ সে জাতি করুণা চাইছে।

যে জাতি একদিন সভ্যতা গড়তো, 

আজ সে জাতি সভ্যতার ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।

 ক্রুসেডাররা শুধু শহর দখল করেনি—

তারা আত্মা দখল করেছিল,

তারা মন দখল করেছিল,

তারা আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিয়েছিল।


বন্ধুগণ! এরপর ইতিহাস থেমে থাকলো না।

এরপর এলো নতুন আরো এক ঝড়—

এমন এক ঝড় যা পাহাড় ভেঙে ফেলতে পারে,

এমন এক ঝড় যা নগরী গুঁড়িয়ে দিতে পারে,

এমন এক ঝড় যা সভ্যতাকে মুছে ফেলতে পারে।


বন্ধুগণ! সেই ঝড় হলো মঙ্গোলরা।

তারা এলো ঝড়ের মতো—

তারা এলো বজ্রপাতের মতো—

তারা এলো ধ্বংসের মতো।

তাদের অশ্বারোহীরা ছুটে গেল দিগন্ত চিরে,

তাদের তীর উড়লো বজ্রবেগে,

তাদের তলোয়ার গাইল রক্তের গান।

তারা ধ্বংস করলো বাগদাদ—

জ্ঞান ও সভ্যতার রাজধানী,

মানবতার জ্যোতিস্ময় হৃদয়,

যেখানে বই ছিল পাহাড়ের মতো,

যেখানে জ্ঞান ছিল নদীর মতো,

যেখানে উলামা ছিলেন নক্ষত্রের মতো।


বন্ধুগণ! তারা পুড়িয়ে দিলো গ্রন্থাগার—

যেখানে ছিল শত সহস্র পাণ্ডুলিপি,

যেখানে ছিল শত বছরের গবেষণা,

যেখানে ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন ও ইতিহাস।

তারা বইগুলো ফেললো টাইগ্রিস নদীতে,

নদীর পানি কালো হলো কালি আর রক্তে।


বন্ধুগণ! তারা হত্যা করলো লক্ষ লক্ষ মানুষ—

উলামা, কবি, চিকিৎসক, দার্শনিক, ব্যবসায়ী, ছাত্র—

কেউ রক্ষা পেল না।

তলোয়ার বিচার করলো সবাইকে।

তারা ধ্বংস করলো সভ্যতা—

মসজিদ ধ্বংস হলো, মাদরাসা ধ্বংস হলো,

খানাকাহ ধ্বংস হলো, বাজার ধ্বংস হলো,

নগর ধ্বংস হলো।


মুসলিম উম্মাহ তখন নীরব।

তারা বিভক্ত। তারা দুর্বল।

তারা একদল আরেকদলকে দোষারোপ করায় ব্যস্ত।

তারা ক্ষমতা নিয়ে লড়ছিল,

কিন্তু শত্রু তাদের অস্তিত্ব নিয়েই লড়ছিল।


বন্ধুগণ! এই শূন্যতাই ছিল সুযোগ।

মঙ্গোলরা সেই সুযোগ নিলো— তারা আক্রমণ করলো,

তারা হত্যা করলো, লুট করলো, জ্বালিয়ে দিল, মুছে দিলো—

এমনভাবে মুছে দিলো যে, ইতিহাস নিজেও চমকে উঠলো।

বাগদাদ পতনের পর মুসলিমদেরা আর আগের মতো দাঁড়াতে পারলো না—

কারণ পতন শুধু দেয়াল ভেঙে দেয় না, 

সে আত্মা ভেঙে দেয়, স্বপ্ন ভেঙে দেয়, বিশ্বাস ভেঙে দেয়।


বন্ধুরা, সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল উম্মাহর নীরবতা।  

তারা প্রতিরোধ করলো না।  

তারা বিদ্রোহ করলো না।  

তারা লড়াই করলো না।  

কারণ তারা বিভক্ত ছিল। 


যেখানে কুরআন পড়া হতো রাত-দিন,

যেখানে আয়াতের তিলাওয়াতে নরম হতো হৃদয়,

যেখানে আল্লাহর কালাম ছিল রাষ্ট্রের নীতি,

সেই জায়গায় একদিন ঢুকলো রাজকীয় বিলাস।

সেই মজলিসে উঠলো বাদ্যের সুর,

উঠলো বীনের সুর,

উঠলো নৃত্য ও বিনোদনের গর্জন।


যে আসর ছিল কুরআনের,

যেখানে বসতো ফকিহ, মুফাসসির ও উলামা,

যেখানে প্রশ্ন উঠতো — “আমাদের রব কী বলেছেন?”

সেই আসন হয়ে গেলো মদের আসর,

হয়ে গেলো ভোজ, নৃত্য ও অশ্লীলতার মঞ্চ।

মদের পেয়ালার টুংটাং ঢেকে দিল আয়াতের তিলাওয়াত,

রেশমী পর্দা ঢেকে দিল তাকওয়ার শীতলতা।


বন্ধুগণ! তখনকার অনেক খলিফা কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।

তারা আনন্দ পেলেন কুরআনে নয়, পেলেন রাজত্বে।

আব্বাসীয় দরবারে গজল, সঙ্গীত ও নৃত্য ছিল নিয়মিত আয়োজন,

অনেকে পাগলের মতো প্রতিযোগিতা করলেন কার কণ্ঠস্বর, কার বাদ্যসুর, কার নর্তকী বেশি আকর্ষণীয়।

ইতিহাসে আছে — ইসলামের স্বর্ণযুগেই কিছু খলিফা রাত কাটাতেন মদ, জহর ও নৃত্যশালায়,

আর ভোর হতো শাসন, ষড়যন্ত্র আর ক্ষমতার হিসাব কষতে কষতে।


যেখানে হেদায়াতের ডাক শোনা যেত,

সেই জায়গায় বাজলো বিভক্তির বাদ্য।

এক দল বললো — “আমরাই হক,”

আরেক দল বললো — “আমরাই ধারক।”

কেউ কারো উপর কুরআন প্রয়োগ করলো না,

বরং প্রয়োগ করলো তলোয়ার, রাজনীতি আর উপপত্নী প্রথা।


এভাবেই বদলে গেল অগ্রাধিকার —

কুরআন থেকে রাজনীতি,

তাকওয়া থেকে আনন্দভোগ,

দাওয়াত থেকে আরাম,

উম্মাহ থেকে দারবার।


আর যখন কুরআনকে পাঠানো হলো তাকের ওপর,

তখন উম্মাহকে পাঠানো হলো ইতিহাসের প্রান্তে।


বন্ধুরা, ইতিহাসের প্রতিটি পতনের পর আসে একটি প্রশ্ন—কেন?  

কেন সেই জাতি, যারা একদিন ছিল দুনিয়ার নেতা, আজ পরাজিত?  

কেন সেই জাতি, যারা একদিন ছিল অগ্রণী, আজ পশ্চাতে পড়া?  

কেন সেই জাতি, যারা একদিন ছিল মুক্ত, আজ বন্দী?  

উত্তর একটাই—তারা কুরআনকে ছেড়ে দিয়েছে।  

তারা আল্লাহর কালামকে ভুলে গেছে।  

তারা মানুষের মতকে আল্লাহর বিধানের ওপরে রেখেছে।  


কিন্তু বন্ধুরা, অন্ধকার যত গভীরই হোক, আলো আসবেই।  

অপমান যত ভয়াবহই হোক, মুক্তি আসবেই।  

পতন যত দীর্ঘই হোক, উত্থান আসবেই।  

আশার আলো এখনো আছে।  

আল্লাহর কিতাবেই মুক্তির আলো আছে।  

কুরআনেই আছে উন্নতির সোপান।  

যদি আমরা আবার কুরআনকে আঁকড়ে ধরি, তাহলেই ফিরবে উন্নতির মান।  

যদি আমরা আবার কুরআনকে আঁকড়ে ধরি, তাহলেই ফিরবে মর্যাদা।  

যদি আমরা আবার কুরআনকে আঁকড়ে ধরি, তাহলেই ফিরবে শক্তি।  


যদি আমরা ন্যায় প্রতিষ্ঠা করি, তাহলেই আমরা মহান হবো।  

যদি আমরা সত্য আঁকড়ে ধরি, তাহলেই আমরা নেতা হবো।  

যদি আমরা কুরআনকে আঁকড়ে ধরি, তাহলেই আমরা মুক্ত হবো।  

ন্যায় ছাড়া সভ্যতা নেই।  

সত্য ছাড়া উন্নতি নেই।  

কুরআন ছাড়া মুক্তি নেই।

Post a Comment

0 Comments